
নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহী প্রেসক্লাবই ছিল তাঁর ঘরবাড়ি। দিন-রাতের বড় একটি সময় কাটত সেখানেই। ঘর-সংসার করা হয়ে ওঠেনি। স্ত্রী-সন্তানও ছিল না। জীবনের শেষ সময়টুকুও কখনো প্রেসক্লাবে, কখনো সহকর্মীর বাসায় কেটেছে। অথচ জীবনের দীর্ঘ কর্মযজ্ঞে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছিলেন তিনি। নিজের জন্য সেই সম্পদ ভোগ করেননি। মৃত্যুর মাত্র দুই মাস আগে সবকিছু মানুষের কল্যাণে দিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রাজশাহী প্রেসক্লাবের সদ্য প্রয়াত সভাপতি সাংবাদিক সাইদুর রহমান।
নিজের সম্পদ তিনি দিয়ে গেছেন ‘জননেতা আতাউর রহমান ট্রাস্টে’। তাঁর ইচ্ছা ছিল, এই ট্রাস্টের মাধ্যমে গরিব ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো হবে। জীবনের শেষ দিকের এই সিদ্ধান্তেও ফুটে উঠেছে মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা।
প্রায় দুই বছর ধরে রাজশাহীর সাংবাদিক রাজীব আলী রাতুলের বাসায় থাকতেন সাইদুর রহমান। মৃত্যুর দুই মাস আগে ওই বাসায় বসেই ট্রাস্ট গঠনের উদ্যোগ নেন তিনি। একদিন দুপুরে জরুরি কথা আছে জানিয়ে রাতুল ও তাঁর বাবা মাসুদ রানা সরকারকে ডাকেন। এরপর তাঁদের কাছে নিজের ইচ্ছার কথা জানান।
রাজীব আলী রাতুল বলেন, সাইদুর রহমান সেদিন বলেছিলেন, ‘আমার তো স্ত্রী-সন্তান নেই। আমার ইচ্ছে- আমার যে সম্পদ আছে তা ট্রাস্টে দিয়ে যাব। গরিব-দুঃখী মানুষের কল্যাণে ওই সম্পদ ব্যয় করা হবে।’
সেদিনই ট্রাস্ট গঠনের পরিকল্পনা করা হয়। দুই দিন পর মনোনীত সদস্যদের ডেকে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান সাইদুর রহমান। সবার সম্মতিতে গঠন করা হয় ট্রাস্টের পরিচালনা বোর্ড।
ট্রাস্টের চেয়ারম্যান করা হয়েছে তাঁর বোন আফরোজী রহমান খেলনাকে। সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে সাংবাদিক রাজীব আলী রাতুলের বাবা মাসুদ রানা সরকারকে। সদস্য করা হয়েছে রাজশাহী প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী আসলাম-উদ-দৌলা, সাংবাদিক আল-আমিন, সালাহউদ্দিন মিন্টু এবং তাঁর সহকর্মী দৈনিক ভোরের কাগজের বিজ্ঞাপন প্রতিনিধি মো. জনিসহ ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে।
সাইদুর রহমানের সম্পদের মধ্যে রয়েছে রাজশাহী নগরের পাঠানপাড়ায় ১০ কাঠার একটি প্লট, একটি বাসা ও ব্যাংকে জমা কয়েক কোটি টাকা। এ ছাড়া ব্যবসা করার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তিকে প্রায় দুই কোটি টাকা ধার দিয়েছিলেন তিনি। এসব সম্পদের নথিপত্রও রয়েছে। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী এসব সম্পদ ও পাওনা ট্রাস্টের আওতায় নেওয়া হবে।
তবে ব্যাংকে তাঁর ঠিক কত টাকা ছিল, তা কাউকে জানিয়ে যাননি সাইদুর রহমান। তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সাংবাদিকের ভাষ্য, ব্যাংকে অন্তত দুই কোটি টাকা ছিল। মৃত্যুর আগে সম্প্রতি তিনি সেখান থেকে প্রায় ১৭ লাখ টাকা তুলেছিলেন।
ট্রাস্টের চেয়ারম্যান আফরোজী রহমান খেলনাও ১৭ লাখ টাকা তোলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে বর্তমানে ব্যাংকে কত টাকা রয়েছে, তা তিনি জানাতে পারেননি।
ভাইয়ের রেখে যাওয়া সম্পদের চেয়ে তাঁর রেখে যাওয়া ইচ্ছাটিকেই বড় করে দেখছেন আফরোজী রহমান খেলনা। তিনি বলেন, ‘আমার ভাই সারাজীবন মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। রাজশাহী প্রেসক্লাবকেই তিনি নিজের ঘরবাড়ি ভেবেছেন। সেখান থেকে বহু মানুষের উপকার করেছেন। মৃত্যুর আগেও তিনি মানুষের কল্যাণে সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে গেছেন।’
ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সন্তান
সাইদুর রহমান ছিলেন রাজশাহীর একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি। তাঁর বাবা ছিলেন রাজশাহীর সাবেক গভর্নর ও প্রখ্যাত আইনজীবী আতাউর রহমান। মা ভাষাসৈনিক মনোয়ারা রহমান। তাঁর নানা ছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষানুরাগী মাদার বখশ।
১৯৬৪ সালের দিকে রাজশাহীর পাঠানপাড়ায় জন্ম নেওয়া সাইদুর রহমান পড়াশোনা করেন রাজশাহী গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুল ও রাজশাহী কলেজে। উচ্চশিক্ষার জন্য যান রাশিয়ার মস্কোতে। সেখানে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পর দেশে ফেরেন।
আশির দশকে দৈনিক করতোয়ার মাধ্যমে সাংবাদিকতা শুরু করেন তিনি। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে কাজ করেছেন বিভিন্ন গণমাধ্যমে। সর্বশেষ কর্মরত ছিলেন দৈনিক ভোরের কাগজে। রাজশাহীর সমস্যা, সম্ভাবনা ও মানুষের কথা উঠে এসেছে তাঁর লেখনীতে। শুধু সংবাদ লেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; মানুষের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়েও তাঁকে রাজপথে সক্রিয় দেখা গেছে।
দীর্ঘদিন ধরে কিডনি সমস্যায় ভুগছিলেন সাইদুর রহমান। নিয়মিত ভারতে চিকিৎসা নিতেন। শেষ পর্যন্ত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত রোববার (২১ সেপ্টেম্বর) ভোররাতে মারা যান তিনি। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬২ বছর।
সাইদুর রহমানের জীবনের শেষ সিদ্ধান্তটি যেন তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনেরই প্রতিচ্ছবি। নিজের জন্য জমিয়ে রাখা সম্পদ ভোগ না করে তা রেখে গেছেন মানুষের জন্য। তাঁর মৃত্যুর পর সেই সম্পদ উত্তরাধিকারীদের কাছে নয়, যাবে অসহায় মানুষের কল্যাণে যে মানুষের কথা তিনি সারাজীবন তাঁর সাংবাদিকতা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তুলে ধরেছেন।







