
নিউজ ডেস্ক: সংবিধানের মৌলিক কাঠামোসহ বেশ কিছু জায়গায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। এসব মৌলিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে আবারও গণভোট আয়োজনের চিন্তা করা হচ্ছে। আগামী ডিসেম্বরে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটি প্রতিবেদন দেবে। এরপর জানুয়ারিতে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংশোধনী বিল আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সংসদে বিলটি পাস হলে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গণভোট আয়োজন করা হতে পারে।
রোববার জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পাদক ও সাংবাদিক সংগঠনের নেতাদের বৈঠকে এসব তথ্য জানানো হয়। সংবিধান সংশোধন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার ধারাবাহিকতায় সাংবাদিকদের সঙ্গে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে বৈঠক চলে।
বৈঠকে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের পরামর্শ দেন। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, একই ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী ও দলের প্রধান না থাকা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সংসদের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংস্কারের প্রস্তাব দেন তাঁরা। কেউ কেউ গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বৈঠকে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীনসহ কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সাংবাদিকদের মধ্যে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, নিউএজ সম্পাদক নূরুল কবীর, প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমাদ, সমকাল সম্পাদক শাহেদ মো. আলী, বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, দেশ রূপান্তর সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, ডেইলি ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম, কালবেলা সম্পাদক সন্তোষ শর্মাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
‘মৌলিক পরিবর্তনে গণভোট হবে’
বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে গণভোট আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের বিষয় বলা ছিল। সেটা আওয়ামী লীগ পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে উঠিয়ে দেয়। অভ্যুত্থানের পর উচ্চ আদালত ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করতে আদেশ দিয়েছেন। এটা সংবিধানে আসবে।’
তিনি বলেন, ‘সংবিধানের প্রস্তাবনা, ৮, ৪৮ ও ৫৬ অনুচ্ছেদসহ কিছু জায়গায় যদি সংসদ কোনো পরিবর্তন আনে, তাহলে তা গণভোটে দিতে হবে। সংসদে বিল পাস হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি সই করার আগে সেটা গণভোটে দিতে হবে, এটা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।’
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাসহ আরও দুটি অনুচ্ছেদ যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছিল। ভবিষ্যতে এসব অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনতে হলে সাংবিধানিকভাবে গণভোট দিতে হবে।
তবে পুরো সংবিধান সংশোধনীর ওপর গণভোটের প্রয়োজন হবে না বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, সংশোধনী বিল পাস হওয়ার পর যেসব অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনলে গণভোটের প্রয়োজন হয়, শুধু সেসব অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনা হলে গণভোট করতে হবে। এবার প্রস্তাবনায় পরিবর্তন আসার কথা থাকায় গণভোটের প্রয়োজন হবে।
জানুয়ারিতে সংসদে বিল
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ডিসেম্বরের মধ্যে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটি প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করতে চায়। এরপর আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি বিল তৈরি করবে। জানুয়ারির সংসদ অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনের বিলটি আসতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জুলাই জাতীয় সনদ নাকি বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার—কোনটি সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব পাবে, এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এখানে প্রায়োরিটি হচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদ। তবে নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী যেসব বিষয়ে আমরা ম্যান্ডেট পেয়েছি, সেগুলোও ধারণ করব।’
তিনি বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ আমরা যেভাবে স্বাক্ষর করেছি, সেভাবেই সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করব। এর বাইরেও কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলো ঐকমত্যের আলোচনায় আসেনি বা বাদ পড়েছে। সেগুলোও আমরা ঐকমত্যের ভিত্তিতে গ্রহণ করতে চাই।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের বক্তব্য, মতামত ও অভিমতও বিবেচনায় নেওয়া হবে। যেসব বিষয় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন, সেগুলো সংশোধনের মাধ্যমে এবং যেসব বিষয় আইন প্রণয়নের মাধ্যমে করা সম্ভব, সেগুলো আইন করেই বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
বিরোধী দলকে কমিটিতে আসার আহ্বান
বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সাংবাদিকদের অনেকে বিরোধী দলের সদস্যদের বিশেষ কমিটিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। সরকার এ বিষয়ে একমত এবং বিরোধী দলকে বারবার কমিটিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘তারা যখনই এই কমিটিতে যোগ দেবেন, আমরা তাদের স্বাগত জানাব। সংসদ চলাকালীনও আমরা বারবার বলেছি, আপনারা আসুন, কমিটিতে অংশগ্রহণ করুন। আপনাদের বক্তব্যগুলো নিয়ে আলোচনা হবে এবং সবার মতামতের ভিত্তিতে যেগুলো গ্রহণযোগ্য, সেগুলো গ্রহণ করব।’
তবে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ সরকার নিশ্চিত করতে পারবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু বারবার আহ্বান জানাতে পারি এবং আশা করতে পারি যে তারা এই কমিটিতে অংশগ্রহণ করবেন।’
ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রস্তাব
বৈঠকে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির প্রস্তাব দেন। বিরোধী দলকে আস্থায় নিয়ে সংবিধান সংশোধনের পরামর্শের পাশাপাশি জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও ভাবার কথা বলেন তিনি।
মতিউর রহমান বলেন, বিরোধী দলের সদস্যদের কমিটিতে আনার জন্য আরও চেষ্টা করা প্রয়োজন, যাতে সব দলের অংশগ্রহণে অর্থবহ আলোচনা হয়। অংশীজনদের মতামত নেওয়ার পর তা সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত করারও পরামর্শ দেন তিনি।
ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, রাষ্ট্রের শাসন, আইন ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যের অভাব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশে বাধা তৈরি করেছে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, জাতীয় সংসদের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
একই সঙ্গে বিরোধী দলের জন্য সংসদীয় ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত সুযোগ ও কর্তৃত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিরোধী দলকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান মাহফুজ আনাম।
আবার গণভোটের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন
বৈঠকে কালবেলার সম্পাদক সন্তোষ শর্মা প্রশ্ন করেন, জুলাই অধ্যাদেশ অনুযায়ী গণভোট ও সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এখন জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে নোট অব ডিসেন্টসহ সংবিধান সংশোধনের কাজ চলছে। এ অবস্থায় আবার গণভোটের প্রয়োজন আছে কি না।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘অবশ্যই গণভোট হবে।’
নিউএজ সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, সংবিধান সংশোধন শুধু নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে করা সম্ভব নয়; এ ক্ষেত্রে জনগণের বৃহত্তর অংশের মতামত নিশ্চিত করতে গণভোটের প্রয়োজন রয়েছে। সূত্র- যুগান্তর।







