
ডিবিসি নিউজ ডেস্ক: রাজশাহীতে পুলিশের এক পরিদর্শকের (ইন্সপেক্টর) বিরুদ্ধে নারীর সাথে প্রতারণার গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি চাওর হবার পর ইতিমধ্যে রাজশাহীর পুলিশের ভেতরে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
পুলিশের এক নারী সার্জেন্টের লিখিত অভিযোগে প্রতারণা করে বিয়ে, শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন, জোরপূর্বক গর্ভপাত এবং বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের মতো স্পর্শকাতর কিছু বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে লিখিত অভিযোগে।
একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন স্পর্শকাতর অভিযোগ; যা শুধু শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করে না, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এমন অভিযোগ সত্যিই স্পর্শকাতর ও উদ্বেগজনক।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী মেট্রোপলিটন (আরএমপি) পুলিশের ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত সার্জেন্ট সাবিহা আক্তার সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশের ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে কর্মরত। সেখানেই তিনি পুলিশ ইন্সপেক্টর (ওসি) মাহবুব আলমের বিরুদ্ধে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পুলিশ হেডকোয়ার্টারসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
লিখিত অভিযোগে নারী সার্জেন্ট সাবিহা আক্তার আরও উল্লেখ করেন, একই বাহিনীতে কর্মরত থাকার সুবাদে ২০২০ সালে তাদের মধ্যে পরিচয় হয়। পরিচয়ের সূত্র ধরে ওসি মাহবুব আলমের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে। ওসি মাহবুব ওই সময় আরএমপি’র বোয়ালিয়া মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
এরই মধ্যে ওসি মাহবুব আলম আগের বৈবাহিক তথ্য গোপন রেখে তাকে ফের বিয়ে করেন। বিয়ের আগে নানা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছড়িয়ে প্রলুব্ধ করলেও কিছুদিন পর থেকে সম্পর্কটি আস্তে আস্তে একতরফা ভাবে গড়াতে থাকে।
তাদের অত্যন্ত মধুর সময়টা (সাংসারিক) আরও প্রাণোবন্ত হবার কথা থাকলেও তা কেবল শারীরিক নির্যাতন ও মানসিক চাপের মধ্যে আবদ্ধ থাকে। সাবিহা আক্তার ওসি মাহবুব আলমের সাথে সাংসারিক জীবনে বারবার শারীরিক নির্যাতন ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অসংখ্যবার।
ওসি মাহবুব আলমের একাধিক নারীর সাথে মেলামেশা ও প্রেমের সম্পর্কের অভিযোগ তুলে সাবিহা আক্তার আরও বলেন, ওসি মাহবুব আলমের এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলেই তাকে মারধর ও অপমান-অপদস্ত করা হতো। সাবিহা আক্তার অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর ওসি মাহবুব আলমকে জানানো হলে সাবিহা আক্তারকে জোরপূর্বক চার মাসের বাচ্চা গর্ভপাত করাতে বাধ্য করানো হয়। যার ফলে শারীরিক ও মানসিক জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়েছে সাবিহা আক্তারের।
অভিযোগে আরও বলা হয়, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার আশায় বিশ্বাসের জায়গা থেকে তিনি বিভিন্ন সময় অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা মাহবুবকে প্রায় ২০ লাখ টাকা দেন। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়েছে। বর্তমানে তাদের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে, যার দেখভালের দায়িত্ব সাবিহা একাই পালন করছেন।
এদিকে, অভিযোগে আরও উল্লেখ্য করা হয়, ওসি মাহবুব আলম অন্য এক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। যা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে আরএমপি’র চন্দ্রিমা থানায় থাকাকালীন ওসি মাহবুব আলমের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়।
ভিডিওতে তাকে এক ব্যক্তির কাছ থেকে খামের মধ্যে টাকা নিতে দেখা যায়। পরদিন তাকে চন্দ্রিমা থানা থেকে প্রত্যাহার করে আরএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয় এবং তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও সেই তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি।
এমনকি ওই ঘটনাকে কেন্দ্র পুলিশ সদরদপ্তর থেকে দৃশ্যমান কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থাও না নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে তিনি রাজশাহী রেঞ্জ ডিআইজির অধীনে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে।
আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে তা কেবল ব্যক্তিগত অপরাধ নয়; বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন দায়িত্বশীল সদস্যের গুরুতর নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হবে। একই সঙ্গে এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করা না হলে বাহিনীর প্রতি জনসাধারণের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এদিকে সার্জেন্ট সাবিহা আক্তারকে ফোন করা হলে অভিযোগের কথা স্বীকার করেও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী রেঞ্জ ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, এ বিষয়ে একটি অভিযোগ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মাত্র সাত দিনের প্রেমে বিয়ে করে মেয়েটি আজ অসহায়।
তিনি আরও জানান, নানা অভিযোগের কারণে মাহবুব আলমকে সিরাজগঞ্জ ইন সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে সংযুক্ত করা হয়েছে। তাকে কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।
ঘুষ নেওয়া এবং নারী কেলেঙ্কারিসহ নানা অভিযোগ থাকার পরেও কীভাবে পুলিশের চাকুরির তবিয়তে বহাল আছে প্রশ্নের জবাবে রেঞ্জ ডিআইজি জানান, প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের চাকুরি থেকে বাদ দেওয়া সহজ নয়। কিছু আইনি সীমাবদ্ধতা এবং জটিলতা আছে। বিভাগীয় ব্যবস্থা চলমান রয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে পুলিশ পরিদর্শক মাহবুব আলমকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি বলেও আরটিভি’র অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত সংবাদ সূত্রে জানা গেছে।
নিউজ সূত্র: #Rtv Online News.