
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাবি: দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাকসু, হল সংসদ ও সিনেট প্রতিনিধি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গত ২৮ জুলাই ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর এই নির্বাচন হবে আবাসিক হলগুলোতে। তবে ভোটকেন্দ্র নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক দানা বেঁধেছে। অধিকাংশ ছাত্র সংগঠন একাডেমিক ভবনে ভোটগ্রহণের দাবি জানালেও প্রশাসন তার সিদ্ধান্তে অটল।
একাডেমিক ভবনে ভোটের দাবি জোরালো
নির্বাচন সুষ্ঠু করতে হলে একাডেমিক ভবনে ভোটকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে-এমন দাবি তুলেছেন অধিকাংশ ছাত্র সংগঠনের নেতারা। তাদের মতে, আবাসিক হলে ভোটগ্রহণ হলে প্রভাব বিস্তার, দখলদারিত্ব ও ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে।
ইসলামী ছাত্রশিবির-এর শাখা সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ ফয়সাল বলেন, “৭০ শতাংশ হলে একক দলের আধিপত্য রয়েছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বজায় রাখতে হলে একাডেমিক ভবনে ভোটকেন্দ্র হওয়া উচিত।”
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট-এর আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল অভিযোগ করেন, “ককটেল বিস্ফোরণ, ধর্মগ্রন্থ অবমাননার মতো ঘটনায় প্রমাণ হয় রাবিতে দখলদারিত্ব প্রবণতা রয়েছে। রাকসুকে অপরাজনীতি থেকে বাঁচাতে একাডেমিক ভবনে ভোটকেন্দ্র চাই।”
ছাত্র অধিকার পরিষদ-এর সাধারণ সম্পাদক আল-শাহরিয়া শুভ বলেন, “২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচনে হলে ভোটের নানা সমস্যা দেখা যায়। এবার ডাকসু একাডেমিক ভবনে করছে, রাকসুতেও সেটি অনুসরণ করা উচিত।”
ছাত্র ইউনিয়ন-এর কোষাধ্যক্ষ কায়সার আহমেদ প্রশ্ন তোলেন, “শতকরা ৭০ ভাগ শিক্ষার্থী অনাবাসিক, তাদের হলে গিয়ে ভোট দেয়া কীভাবে যৌক্তিক?”
আবাসিক হলে নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে সমস্যা নেই-মত ভিন্নমতের নেতাদের
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন-এর সাবেক সমন্বয়ক ফাহিম রেজা বলেন, “একাডেমিক ভবনে হলে ভোটারদের ভিড় বেড়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে যেখানে ভোট হোক, সেখানে সিসিটিভি, সাংবাদিকদের লাইভ কাভারেজ নিশ্চিত করতে হবে।”
আরেক সাবেক নেতা মেহেদী সজীব বলেন, “একাডেমিক ভবন অপেক্ষাকৃত নিরাপদ হলেও, প্রশাসন যদি হলে যথাযথ নিরাপত্তা দেয়, তাহলে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হতে পারে।”
প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন ছাত্রদলের
রাবি ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, “রাকসু নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র একাডেমিক ভবনে হলে নিরাপদ হবে। তবে প্রশাসন জামায়াতের প্রভাবাধীন, উপাচার্য নিরপেক্ষতা হারিয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, “উপাচার্য ও কমিশনাররা আত্মীয়-স্বজনের চাকরির লোভে বিক্রি হয়ে গেছেন। ক্যাম্পাসে সহিংসতা, নারীর প্রতি অনলাইন হেনস্তা, ভিন্নমতের উপর হামলার ঘটনায় প্রমাণ হয় এখনো নির্বাচন উপযোগী পরিবেশ গড়ে ওঠেনি।”
প্রশাসনের জবাব: হলেই হবে ভোট, প্রস্তুতি চলছে
রাকসু নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক আমজাদ হোসেন বলেন, “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো পাশাপাশি অবস্থিত, তাই হলেই ভোট হবে। একাডেমিক ভবনে ভোট ঝুঁকিপূর্ণ। নিরাপত্তার জন্য পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা নেওয়া হবে।”
ছাত্রদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, “এটি শেখ হাসিনার নির্বাচন নয়, কারও প্রভাব চলবে না। কমিশন কঠোর অবস্থানে থাকবে।”
অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি আরও বলেন, “আমরা কারও আত্মীয় নই, চাকরির প্রলোভনে কেউ বিক্রি হয়নি।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীব-এর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।
পটভূমি
রাকসু নির্বাচন সর্বশেষ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৯ সালে। দীর্ঘদিন পর ঘোষিত এই নির্বাচন ঘিরে শিক্ষার্থীদের আগ্রহের পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে এর সুষ্ঠুতা নিয়েও। ভোটকেন্দ্র কোথায় হবে, তা নিয়ে মতভেদ তীব্র হলেও শিক্ষার্থীরা একটি সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চান-এতে কোনো দ্বিমত নেই।