নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীর পবা উপজেলায় কৃষকদের মধ্যে সারের সুষম বণ্টন নিশ্চিত এবং কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে ‘পবা সার ডটকম’ নামে ডিজিটাল সেবা চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে উপজেলার বিভিন্ন ডিলারের কাছে সারের মজুত, বিক্রি ও অবশিষ্ট পরিমাণের তথ্য অনলাইনে পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে পবা উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে এ সেবার উদ্বোধন করেন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার মো. ইউসুফ আলী। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইবনুল আবেদীন। সঞ্চালনা করেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এম এ মান্নান।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইবনুল আবেদীন বলেন, সরকার কৃষিতে ভর্তুকি দিয়ে পর্যাপ্ত সার বরাদ্দ দিচ্ছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে তদারকির সময় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকার পরও সুষম বণ্টনের অভাবে অনেক কৃষক তাঁদের ন্যায্য পরিমাণ সার পাচ্ছেন না। আবার কোনো কোনো কৃষক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার নেওয়ায় অন্য কৃষক তাঁর প্রাপ্য সার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, এসব সমস্যা বিবেচনায় নিয়ে ‘পবা সার ডটকম’ চালু করা হয়েছে। এতে কৃষকদের নতুন কোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে না। তাঁরা আগের মতোই ডিলারের কাছ থেকে সার কিনবেন। শুধু ডিলারদের তাঁদের মজুত ও বিক্রির তথ্য ওয়েবসাইটে নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। এর ফলে প্রশাসন অনলাইনে জানতে পারবে, কোন ডিলারের কাছে কী পরিমাণ সার মজুত রয়েছে।
পবা উপজেলার প্রায় ২৫ জন ডিলারের মজুতের তথ্য ওয়েবসাইটের নিয়ন্ত্রণকক্ষে দেখা যাবে। কোনো এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় অস্বাভাবিক পরিমাণ সার বিক্রি হলে সেখানে সতর্কবার্তা দেখা যাবে। পরে সংশ্লিষ্ট এলাকায় তদন্তকারী কর্মকর্তা পাঠিয়ে বিষয়টি যাচাই করা হবে।
সার বিতরণব্যবস্থা তদারকির জন্য উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সার পাওয়ার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করবেন। তাঁদের পরিদর্শনের স্থান বৈশ্বিক অবস্থান নির্ণয় ব্যবস্থার মাধ্যমে নথিভুক্ত হবে। এরপর উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের ১০ জন তদারকি কর্মকর্তা তাঁদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন। পুরো ব্যবস্থাটি উপজেলা প্রশাসনের নজরদারিতেও থাকবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, ‘পবা সার ডটকম’ মূলত একটি অগ্রসর ওয়েবভিত্তিক সেবা। এটি ওয়েবসাইট হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি মুঠোফোনে সংযুক্ত করে অ্যাপের মতো ব্যবহার করা যাবে। বর্তমানে এটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে। ব্যবহারকারীদের মতামতের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে এতে পরিবর্তন ও নতুন সুবিধা যুক্ত করা হবে।
জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, প্রান্তিক কৃষকের কাছে সঠিক সময়ে সার পৌঁছে দেওয়া প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার পরও কখনো কখনো কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করা হয়। এই উদ্যোগের মাধ্যমে তা ঠেকানোর পাশাপাশি কৃষকের কাছে সার পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে পবায় পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবস্থাটি চালু করা হয়েছে। এটি সফল হলে পর্যায়ক্রমে রাজশাহী জেলার অন্যান্য উপজেলাতেও একই ব্যবস্থা চালু করা হবে।
বিভাগীয় কমিশনার মো. ইউসুফ আলী বলেন, কৃষি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণগুলোর একটি হলো সার। ফসলের বৃদ্ধি, ফুল ও ফল ধারণের জন্য সারের প্রয়োজন রয়েছে। তাই সারের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, শুধু ডিলারদের কাছে কত পরিমাণ সার মজুত রয়েছে, সেই তথ্য থাকলেই হবে না। কোন এলাকায় কতজন কৃষক রয়েছেন, তাঁদের কতটুকু চাষযোগ্য জমি রয়েছে, কোন মৌসুমে কী ফসল চাষ করছেন এবং ওই ফসলের জন্য কী পরিমাণ সার প্রয়োজন—এসব তথ্যও ডিজিটাল ব্যবস্থায় যুক্ত করা প্রয়োজন।
বিভাগীয় কমিশনার আরও বলেন, আমন মৌসুমে কোনো কৃষি এলাকায় কতজন কৃষক কতটুকু জমিতে চাষ করছেন, তা জানা থাকলে ওই এলাকার সম্ভাব্য সারের চাহিদা আগেই নির্ধারণ করা সম্ভব। ফসলভেদে ইউরিয়া, ডিএপি, এমওপি ও টিএসপির চাহিদাও নির্ধারণ করা যাবে। পাশাপাশি কৃষকদের তালিকা ও তাঁদের সারের চাহিদার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট ডিলার নির্ধারণ করে দেওয়া হলে কোন কৃষক কোন ডিলারের কাছ থেকে সার নেবেন, সেটিও আগে থেকেই জানা থাকবে। এতে কৃষকদের বিভ্রান্তি কমার পাশাপাশি সার বিতরণে স্বচ্ছতা বাড়বে।
বর্তমানে সারের মজুত পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, সরকারি পর্যায়ে বাফার গুদাম এবং বিসিআইসি ও বিএডিসির গুদামে পর্যাপ্ত সার রয়েছে। তবে ডিলারদের গুদামে থাকা মজুতের ওপরও নজরদারি প্রয়োজন। কোনো কৃষক প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার নিয়ে বাড়িতে মজুত করছেন কি না, সেটিও মাঠপর্যায়ে তদারকি করা হচ্ছে। অনিয়ম পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
‘পবা সার’ প্রকল্পটির নকশা, পরিচালনা ও কারিগরি উন্নয়ন করেছে সিল্কোরা কনসালটেন্সি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, নতুন এই ব্যবস্থায় সার বরাদ্দ, মজুত, বিক্রি ও বিতরণের তথ্য একই প্ল্যাটফর্মে আনা হয়েছে। এতে কৃষক, ডিলার ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে দেখতে পারবেন। পাশাপাশি অনিয়ম শনাক্ত করা এবং সঠিক সময়ে কৃষকের কাছে সার পৌঁছে দেওয়াও সহজ হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সারের ডিলার, কৃষক ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।