চাকরি ছাড়ার জেরে সাবেক কর্মীকে তুলে নিয়ে মারধর ও জোর করে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ; অস্বীকার প্রতিষ্ঠানের মালিকের।
নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীতে একটি গাড়ি বিক্রয় ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছেড়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ায় সাবেক এক কর্মীকে অপহরণ করে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। শাহীন আহমেদ (২৫) নামের ওই যুবককে একটি গাড়িতে তুলে নগরের মেহেরচন্ডি এলাকায় প্রতিষ্ঠানের সেবাকেন্দ্রে নিয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা আটকে রেখে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। পরে তাকে বাসে তুলে ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী শাহীন আহমেদ ঢাকার বাসিন্দা। তিনি রাজশাহীর অটো স্পার্ক নামের একটি প্রতিষ্ঠানে প্রায় তিন বছর প্রধান রংমিস্ত্রি হিসেবে কাজ করেন। প্রায় দেড় মাস আগে চাকরি ছেড়ে তিনি আরশি অটোমোবাইল অ্যান্ড কার হাব নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। পরে অটো স্পার্কের আরও পাঁচজন কর্মী ওই প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই অটো স্পার্কের কর্ণধার রাজু আহমেদ শাহীনের ওপর ক্ষুব্ধ হন বলে অভিযোগ।
শাহীন জানান, গত ২২ আগস্ট সন্ধ্যার পর নগরের সপুরা এলাকায় নতুন কর্মস্থলের কাজ শেষে বের হওয়ার সময় অটো স্পার্কের কর্ণধার রাজু আহমেদ, তাঁর চাচা রুস্তম আলী ও ব্যবস্থাপক মো. শুভ তাকে অনুসরণ করেন। একপর্যায়ে তারা কথা বলার কথা বলে শাহীনের কাছে আসেন এবং তাঁর মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে বন্ধ করে দেন।
এর কিছুক্ষণ পর একটি ব্যক্তিগত গাড়ি সেখানে এসে থামে। গাড়িতে কৌশিক, আমির ও ফরহাদ নামের তিন যুবক ছিলেন বলে দাবি করেন শাহীন। গাড়ির দরজা খোলার পর রাজু আহমেদ ধাক্কা দিয়ে তাকে গাড়ির ভেতরে ঢুকিয়ে দেন। এরপর তাকে মেহেরচন্ডি এলাকায় অটো স্পার্কের একটি সেবাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়।
শাহীন অভিযোগ করেন, সেখানে একটি কক্ষে আটকে রেখে তাকে মারধর করা হয়। তার বিরুদ্ধে অটো স্পার্কের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে চাকরি ছাড়ার এবং আরও পাঁচজন কর্মীকে সঙ্গে নেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে নির্যাতনের একপর্যায়ে পাঁজরে গুরুতর আঘাত পান বলে দাবি করেন তিনি।
শাহীন বলেন, প্রাণ বাঁচাতে তিনি আর রাজশাহীতে থাকবেন না বলে জানান। এরপর নির্যাতন বন্ধ করা হয়। পরে অটো স্পার্কের দুটি ফাঁকা কাগজে জোর করে তাঁর স্বাক্ষর ও টিপসই নেওয়া হয়। তাঁর মোবাইল ফোনের দুটি সিমকার্ডও খুলে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এরপর অভিযুক্তরা বাসের টিকিট কেটে ওই রাতেই তাকে ঢাকাগামী বাসে তুলে দেন। ঢাকায় ফিরে শাহীন চিকিৎসা নেন। পরে মোবাইল ফোনে সিমকার্ড না থাকায় তিনি কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি বলে জানান।
এদিকে শাহীনের কোনো খোঁজ না পেয়ে পরদিন ২৩ আগস্ট আরশি অটোমোবাইল অ্যান্ড কার হাবের ব্যবস্থাপক সোয়াদ আহমেদ বোয়ালিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে শাহীন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে পুরো ঘটনা জানান।
শাহীন ঢাকায় ফিরে শরীরের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতনের চিহ্নের ভিডিওচিত্রও পাঠান বলে জানা গেছে।
তবে অপহরণ বা নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অটো স্পার্কের কর্ণধার রাজু আহমেদ। তাঁর দাবি, শাহীনের সঙ্গে চাকরি ছাড়ার আগে ছয় মাস আগে জানানোর বিষয়ে চুক্তি ছিল। কিন্তু তিনি কোনো কিছু না জানিয়েই চাকরি ছেড়ে দেন এবং পরে আরও পাঁচজন কর্মীকে অন্য প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যান।
ফাঁকা কাগজে জোর করে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন রাজু আহমেদ। তাঁর দাবি, মায়ের চিকিৎসার জন্য শাহীন কয়েক মাসের বেতন অগ্রিম নিয়েছিলেন এবং ওই অর্থসংক্রান্ত বিষয়েই কাগজে তাঁর স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানের কিছু টাকা জমা না দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন করতে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে দাবি করেন।
বোয়ালিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাছুমা মোস্তারি বলেন, শাহীনকে পরে পাওয়া গেছে। ফলে নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরি নিয়ে এখন আর কোনো করণীয় নেই। শারীরিক নির্যাতনের বিষয়টি তিনি শুনেছেন। এ বিষয়ে শাহীনকে লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। তিনি মামলা করতে চাইলে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে শাহীন ঢাকা থেকে আর রাজশাহীতে আসেননি বলে জানান তিনি।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগ এবং তদন্তের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ।