আব্দুল লতিফ মিঞা,বাঘা (রাজশাহী): এক সময় যে গ্রামে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। শিক্ষিত মানুষ ছিল হাতে গোনা। সেই
বাজু বাঘা নতুনপাড়া গ্রামকে আজ নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন মোসাঃ সাদিয়া
আফরিন। ৪৭তম বিসিএসে তথ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে গ্রামের মান উঁচু করেছেন
তিনি।
নতুনপাড়া গ্রামের জন্মকথা-:
গ্রামটির আসল নাম বাজু বাঘা। এই গ্রামের নামেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাজু বাঘা
ইউনিয়ন পরিষদ। ‘ ১৯৬০ সালে নদীভাঙনের শিকার বিশাল এক জনগোষ্ঠী এসে এখানে ভিড়
জমায়।
মালিকের অনুমতি ছাড়াই জঙলভর্তি অনাবাদি জমিতে ঘরের চালা ফেলে বসবাস শুরু করেন তারা।
পরে প্রয়াত নূরুল হোসেন মিঞার ছেলে ও তার বোনের ছেলের কাছ থেকে নাম মাত্র দামে জমি
কিনে স্থায়ী বসতি গড়েন তারা। সেই থেকেই বাজু বাঘার সাথে যোগ হয় "নতুনপাড়া"।
বাজুবাঘা মৌজায় নতুন বসতি গড়ে তোলা ওইসব জমির মূল মালিক ছিলেন প্রয়াত ˆসৈয়দ
হোসেন মিঞা,লোহারি প্রামানিক ও নইলি পাড়ের কিছু পরিবার। গ্রামটি রাজশাহীর বাঘা
উপজেলার বাঘা পৌরসভার অধীনে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষানুরাগী সহকারি অধ্যাপক (অবসর প্রাপ্ত) মাজদার রহমান বলেন, "নদীভাঙা
মানুষের বসতি গড়ার আগে প্রয়াত ˆসৈয়দ হোসেন মিঞার পরিবার ছাড়া এই গ্রামে দ্বিতীয়
কোনো পরিবার ছিল না। সেই সময় অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। অনেকেই রাত কাটিয়েছেন
উপোসে।"
সেই নতুন পাড়াতেই বাপ-দাদার আদলে বেড়ে উঠেছেন সাদিয়া আফরিন। অতীতের সেই দিন
পেরিয়ে এখন গ্রামে শিক্ষার হার ও চাকুরিজীবির সংখ্যাও বেড়েছে । আর তারই ফসল হিসেবে
বিসিএস তথ্য ক্যাডার(১২১)-এ ৫ম স্থান অধিকার করেন সাদিয়া।
ছোট বেলা থেকেই অদম্য মেধাবী সাদিয়া ৮ম শ্রেণিতে বৃত্তি, ২০১৩ সালে বাঘা উচ্চ
বিদ্যালয় থেকে এসএসসি (জিপিএ- ৫), ২০১৫ সালে মোজাহার হোসেন মহিলা কলেজ থেকে
বিজ্ঞান বিভাগে কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি পাশ করেন।
পরে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফুড এন্ড প্রসেস
ইঞ্জিনিয়ারিং (অনার্স) ও ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি (মাস্টার্স) পাশ করেন। ২০২৪
সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরিতে যোগ দেন এবং বর্তমানে ২০২৩ সাল ভিত্তিক
অফিসার জেনারেলে সুপারিশ প্রাপ্ত হন।
জানা যায়, সাদিয়ার বাবাও জীবনে অনেক কষ্টের মধ্যে দিয়ে বিএসসি পাস করেছেন। ব্যাংকের চাকরির সুবাদেই পরিবারের মোড় ঘুরিয়েছেন তার বাবা। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী সাদিয়া বাবা-মায়ের
দোয়া আর নিজের চেষ্টায় আজ এই জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছেন। সাদিয়া বলেন, যখন আমি নিজে বুঝতে শিখেছি তখন থেকে প্রবল ইচ্ছা জাগছে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার। সেই ইচ্ছা পূরণে ব্যাপক পড়াশোনা করতে হয়েছে। তবে তার ইচ্ছা শক্তির সাথে শিক্ষক ও বাবা মার অবদান অনেক বেশি ছিল।
পিতা গিয়াস উদ্দিন
আহমেদ, অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা,মাতা হাসিনা আহমেদ গৃহিণী। তিনি জানান, তার
দুই ছেলে ও এক বোনের মধ্যে সাদিয়া ছোট। ছেলেরা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে করর্মরত। সাদিয়ার সাফল্যে তিনি গর্বিত।
কলেজ ও এলাকার প্রতিক্রিয়া-:
মোজাহার হোসেন মহিলা ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ নছিম উদ্দিন তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, "কলেজের পক্ষ থেকে প্রিয় ছাত্রী সাদিয়া আফরিনকে ধন্যবাদ| মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি তার কর্মময় জীবন কল্যাণময় হোক।" গ্রামবাসীরা বলছেন, একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক অফিসারের মেয়ে বিসিএস ক্যাডার হওয়ায় বাজু বাঘা নতুনপাড়া এখন গর্বের নাম।
গ্রামের কলেজ শিক্ষক আব্দুল হানিফ মিঞা বলেন, "আমার দাদা নূরুল হোসেন মিঞার ছেড়ে দেওয়া মাটিতে আজ বিসিএস ক্যাডার ˆতৈরি হচ্ছে, এটাই বড় পাওয়া। সাদিয়া শুধু তার বাবা-মা নয়, পুরো গ্রামকে গর্বিত করেছে।"