
নিজস্ব প্রতিবেদক : দুর্নীতির দুই মামলা আদালতে চলমান অবস্থায় রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) সাময়িক বরখাস্ত একজন প্রকৌশলীকে পূণর্বহাল করা হয়েছে। পূণর্বহাল হওয়া সহকারি প্রকৌশলীর নাম শেখ কামরুজ্জামান। নিয়োগ দুর্নীতি ছাড়াও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের ( দুদক) পৃথক আরেকটি মামলায় সহকারি প্রকৌশলী শেখ কামরুজ্জামান কারাগারে গেলে কর্তৃপক্ষ সরকারি চাকরি-বিধিমালা অনুযায়ী তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেন কর্তৃপক্ষ।
তবে গত ৫ আগষ্টে সরকার পরিবর্তনের পর বিভিন্ন দলের কতিপয় নেতার সুপারিশের জোরে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান তার সাময়িক বরখাস্তের আদেশ তুলে নিয়ে স্বপদে বহাল করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা কর্মচারিদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে পূণর্বহাল হওয়ার পর শেখ কামরুজ্জামান আরডিএর অথরাইজড অফিসার পদ পেতে মরিয়া হয়ে তদবির শুরু করেছেন।
এই বিষয়ে আরডিএর চেয়ারম্যান এসএম তুহিনুর আলম জানিয়েছেন, যে স্মারকে শেখ কামরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল উচ্চ আদালত সেই স্মারকের কার্যকারিতা ছয় মাসের জন্য স্থগিত করেছেন। তবে আমরা এই স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে আইনী লড়াই করার জন্য ইতিমধ্যে আইনজীবী নিয়োগ করেছি। শিগগির আপিল করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান (যুগ্ম-সচিব) এসএম তুহিনুর আলম স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া সহকারি প্রকৌশলী শেখ কামরুজ্জামানের বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহার করে তাকে পূণর্বহাল করেন। এর আগে ২০২৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আরডিএর সাবেক চেয়ারম্যান (যুগ্ম-সচিব) মো. জিয়াউল হক সহকারি প্রকৌশলী শেখ কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা দু’টি মামলায় প্রাথমিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তাকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেন।
নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে,
২০০৪ সালে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সহকারি প্রকৌশলী হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন শেখ কামরুজ্জামান। আদালতে দুর্নীতি দমন কমিশনের দাখিলকৃত অভিযোগপত্রে (চার্জশীট) উল্লেখ করা হয়েছে আলোচিত নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতি হয়। সহকারি প্রকৌশলী পদের লিখিত পরীক্ষায় শেখ কামরুজ্জামান অকৃতকার্য হন।
আরডিএর তৎকালীন চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নানসহ নিয়োগ কমিটি দুর্নীতি করার জন্য লিখিত পরীক্ষার ফলাফল বাতিল করেন। পরে সরকারি নিয়োগ বিধিমালা লঙ্ঘন করে লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই শুধুমাত্র মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। শেখ কামরুজ্জামান সহকারি প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পান এবং আরডিএতে যোগদান করেন।
এদিকে বিতর্কিত এই নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ এনে বঞ্চিত প্রার্থীরা দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। দীর্ঘ অনুসন্ধান ও তদন্তের পর দুর্নীতি দমন কমিশনের তৎকালীন উপ-পরিচালক আব্দুল করিম ২০১১ সালের ১৭ জুলাই শেখ কামরুজ্জামানসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
দীর্ঘ সাত বছর দুদকের তিনজন উপ-পরিচালক তদন্তের পর উপ-পরিচালক ফরিদুর রহমান ২০১৮ সালের ১৪ জানুয়ারি শেখ কামরুজ্জামানসহ তিনজনের বিরুদ্ধে রাজশাহী বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতে চার্জশীট দাখিল করেন। আদালতে উপস্থিত হয়ে কামরুজ্জামান জামিন গ্রহণ করেন। মামলাটি বর্তমানে বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতে বিচারাধীন।
অন্যদিকে, শেখ কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ হলে দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারি পরিচালক আমির হোসাইন অনুসন্ধান শেষে ২০২২ সালের ১ জুন ১ কোটি ৬ লাখ ৬৯ হাজার টাকার সম্পদ অবৈধভাবে অর্জনের অভিযোগে মানি লণ্ডারিং আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। একই দিনে ৬০ লাখ ৬২ হাজার ১১৮ টাকার সম্পদ অবৈধভাবে অর্জনের অভিযোগে দুদক শেখ কামরুজ্জামানের স্ত্রী নিশাত তামান্নার বিরুদ্ধেও পৃথক আরেকটি মামলা করেন।
তদন্ত শেষে দুদকের এই কর্মকর্তা ২০২৩ সালের ২৮ আগষ্ট শেখ কামরুজ্জামান ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে রাজশাহী মহানগর স্পেশাল জজ আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। ২০২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর জামিন নিতে গেলে আদালতের বিচারক, শেখ কামরুজ্জামান ও তার স্ত্রী নিশাত তামান্নাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। প্রায় আড়াই মাস কারাগারে থেকে পরে জামিনে মুক্তি পান তারা। এরপরই সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী শেখ কামরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শেখ কামরুজ্জামানের দু’টি দুর্নীতির মামলা বর্তমানে রাজশাহী বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলায় কামরুজ্জামান নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিয়ে আসছেন। গত ৫ আগষ্ট সরকার পরিবর্তনের পর কামরুজ্জামান বিভিন্ন মহলে নিজেকে মজলুম কর্মকর্তা দাবি করে জোর তদবির শুরু করেন।
তার সাময়িক বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহারের জন্য রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের ওপর অব্যাহতভাবে অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেন। এমনকী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কয়েকজনকে তিনি ভুল বুঝিয়ে আরডিএ ভবনে নিয়ে গিয়ে কর্মকর্তাদের ওপর চাপ তৈরি করেন তাকে পূণর্বহালের জন্য। কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত তার সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে পূণর্বহাল করেন।
এদিকে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শেখ কামরুজ্জামান তার বরখাস্ত আদেশ স্থগিতে গত ৬ জানুয়ারি উচ্চ আদালতে একটি রিট আবেদন করেন। শুনানি শেষে উচ্চ আদালতের একটি বেঞ্চ শেখ কামরুজ্জামানের সাময়িক বরখাস্ত আদেশ ছয় মাসের জন্য স্থগিত করে আদেশ দেন।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে পূণর্বহাল হওয়া আরডিএর সহকারি প্রকৌশলী শেখ কামরুজ্জামান বলেন, তার বিরুদ্ধে একটি মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমি উচ্চ আদালতের রায় নিয়ে পূণর্বহাল হয়েছি। দুর্নীতির অভিযোগ আদালতে এখনো প্রমাণিত হয়নি। ফলে আমি স্বপদে কাজ করছি।
অন্যদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশনের রাজশাহী সমন্বিত জেলার উপ-পরিচালক মো. ফজলুল বারী বলেন, শেখ কামরুজ্জামানকে পূণর্বহালের বিষয়টি আমাদের জ্ঞাতে নেই। পুরো বিষয়টি জানার পর আমরা মতামত দিতে পারব। তবে শেখ কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুদকের দু’টি মামলা আদালতে বিচারাধীন বলে নিশ্চিত করেন তিনি।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এসএম তুহিনুর আলম মঙ্গলবার বলেন, আরডিএর যে স্মারকে কামরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল আদালত সেই স্মারকের কার্যকারিতা স্থগিত করেছেন। এ কারণে তাকে পূণর্বহালের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
চেয়ারম্যান আরও বলেন, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ স্থতিগাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য ইতিমধ্যে একজন আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছেন। আরডিএ আইনী পথে এগোবে। দুর্নীতির মামলায় কারাগারে যাওয়ায় সরকারি চাকরি-বিধিমালা মোতাবেক তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।







