স্টাফ রিপোর্টার, দুর্গাপুর: রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার নওপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আজাদ আলীর (৬২) উপরে হামলা চালিয়ে এলোপাতাড়ি মারপিট করেছেন একই ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা। এ সময় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আজাদ আলী প্রাণে বাঁচতে মোটরসাইকেল ফেলে পুকুরে ঝাঁপ দেন। ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন গিয়ে আজাদ আলীকে পুকুর থেকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। খবর পেয়ে দুর্গাপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ওই ঘটনায় থানায় কোন পক্ষই লিখিত অভিযোগ করেননি বলেও জানায় পুলিশ।
মারপিটের শিকার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আজাদ আলী ৫ নম্বর ওয়ার্ড (নান্দীগ্রাম) বিএনপির সভাপতি এবং নওপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য (প্যানেল চেয়ারম্যান)।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ওই ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম শফিকে বরখাস্ত করা হয়। পরবর্তীতে প্রশাসনিক আদেশে প্যানেল চেয়ারম্যান ও নান্দীগ্রাম ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আজাদ আলীকে নওপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য নিযুক্ত করা হয়।
বুধবার দুপুর দেড়টার দিকে নওপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের অন্তর্গত শ্যামপুর গ্রামে এই ঘটনা ঘটার পর পুলিশ, ইউনিয়ন পরিষদের একাধিক ইউপি সদস্য ও স্থানীয় লোকজন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। এ সংক্রান্ত ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে।
পুলিশ ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বুধবার দুপুর দেড়টার দিকে শ্যামপুর বাজার হয়ে মোটরসাইকেল যোগে উপজেলা সদরের দিকে যাচ্ছিলেন আজাদ আলী। শ্যামপুর বাজারে আগে থেকেই ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকজন ইউপি সদস্য অবস্থান করছিলেন। এ সময় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আজাদ আলী শ্যামপুর বাজারে পৌঁছামাত্রই অভিযুক্ত ইউপি সদস্যরা তার পথরোধ করে এলোপাতাড়ি মারপিট শুরু করেন। মারপিটের একপর্যায়ে প্রাণে বাঁচতে আজাদ আলী মোটরসাইকেল ফেলে রাস্তার পাশেই পুকুরে ঝাঁপ দেন। ঘটনার খবর পেয়ে স্থানীয় লোকজন উপস্থিত হয়ে আদত আলীকে পুকুর থেকে উদ্ধার করেন এবং তার চিকিৎসার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।
নওপাড়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অভিযোগ করেন, একই ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য ও শ্যামপুর ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রেজাউল ইসলামের নেতৃত্বে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে তার উপরে অতর্কিত হামলা চালানো হয়েছে। হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
জানা গেছে, হতদরিদ্র অসহায় ও দুস্থদের নামে ভিজিএফ কার্ড ইস্যু করে চাল বিতরণ করা হচ্ছিল। এই তালিকা প্রস্তুত করা নিয়ে স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি'র নেতাকর্মীর সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আজাদ আলীর সাথে বিরোধ তৈরি হয়। বুধবার দুপুরে আজাদ আলী ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় থেকে বের হয়ে মোটরসাইকেল যোগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। শ্যামপুর বাজারে পৌঁছালে তার পথরোধ করা হয়। এ সময় পথরোধ করার কারণ জানতে চাইলে কিছু বুঝে ওঠার আগেই অতর্কিতভাবে আজাদ আলীকে মারপিট শুরু করা হয়। ঘটনার একপর্যায়ে প্রাণে বাঁচতে রাস্তার উপরেই মোটরসাইকেল ফেলে রাস্তার পাশের পুকুরে ঝাপ দেন আজাদ আলী।
নওপাড়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর (শ্যামপুর) ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাকিম জানান, শ্যামপুর ওয়ার্ডে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে চেয়ারম্যান কার্ডের তালিকা প্রস্তুত করেছেন এবং ওই তালিকা অনুযায়ী চাল বিতরণ করা হচ্ছিলো। এতে শ্যামপুর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য রেজাউল ইসলাম ও বিএনপি নেতা আফাজ আলী ক্ষিপ্ত হয়ে আজাদ আলীর পথরোধ করে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালান।
এদিকে, ওই ঘটনায় অভিযুক্ত সাবেক ইউপি সদস্য রেজাউল ইসলাম হামলা ও মারপিটের ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে দাবি করেন, ভিজিএফ কার্ড দেয়ার আশ্বাস দিয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আজাদ আলী তার কাছে ৫ হাজার টাকা দাবি করেছিলেন। এই কারণেই আজাদ আলীকে মারধোর করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
অপরদিকে, নওপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আজাদ আলী সাবেক ইউপি সদস্য রেজাউল ইসলামের আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে যাওয়ার পথে শ্যামপুর গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য রেজাউল ইসলাম, স্থানীয় বিএনপি নেতা আফাজ, বিপ্লব, বেলালসহ আরও কয়েকজন তার পথরোধ করে হামলা চালায় এবং এলোপাতাড়ি মারপিট শুরু করেন। এ সময় তার কাছে থাকা পরিষদের দাপ্তরিক কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও ছিনিয়ে নেয়া হয়।
আজাদ আলী আরও অভিযোগ করেন, ভিজিএফ কার্ড দেয়ার আশ্বাসে টাকা দাবি করার অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। বরং ভিজিএফ কার্ড দেয়ার জন্য সাবেক ইউপি সদস্য রেজাউল ইসলামসহ কয়েকজন ব্যাক্তি মোট ২৪০ জনের একটি তালিকা তার কাছে দিয়েছিলেন। সেই তালিকা অনুযায়ী কার্ড দিতে না পারায় ক্ষুব্ধ হয়ে তারা তাঁর ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়ে মারপিট ও তাঁর ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ভাঙচুর করেছে।
দুর্গাপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শফিকুল ইসলাম জানান, নওপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়ে চিকিৎসারত অবস্থায় তাকে ফোন করে বিষয়টি জানিয়েছেন। তবে কোনো লিখিত অভিযোগ করেননি। চিকিৎসা নিয়ে থানায় এসে তাকে লিখিত অভিযোগ দেয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাশতুরা আমিনা জানান, ঘটনার পর ভারপ্রাপ্ত ল চেয়ারম্যান তাকে ফোনে বিষয়টি অবহিত করেছেন। এ ব্যপারে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আজাদ আলীকে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।