
❝রাতারাতি বদলে গেছে তালিকা, অকৃতকার্য ছাত্রদল নেতা প্রথম, বিএনপি নেতার কন্যা-স্বজন, ছাত্রলীগ কর্মী ও ইউএনও অফিসের কর্মকর্তার স্ত্রী!❞
বিশেষ প্রতিনিধি: বর্তমান সরকারের উদ্যোগে প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ন্যায্যতা ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত কল্পে গৃহীত ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পে প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচনের উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে বিপত্তি দেখা দেয় প্রকৃত সুবিধাভোগীর তালিকা নিরূপণে। শুরুর দিকে নানা বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়ায় শুমারির মাধ্যমে প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচনে সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারী পদে (অস্থায়ী) জনবল নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কিন্তু এতে আরও বিপত্তি-বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। শুমারিতে জনবল নিয়োগের নিমিত্তে লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার আগে থেকেই নিজেদের বলয়ের লোকজনকে নিয়োগ দিতে গিয়ে উল্টো সরকার দলীয় নেতাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে। বাড়ছে নেতায় নেতায় দ্বন্দ-দূরত্ব। এমনকি ইউএনও'র কার্যালয় ঘেরাও, ভাংচুর, বিক্ষোভ প্রদর্শনসহ উপজেলা প্রশাসনের সাথে দ্বন্দ যেন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন ও সরকার দলীয় একাধিক সংগঠনের নেতাদের স্বজনপ্রীতি, নিয়োগে অযাচিত হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বিস্তার, মোবাইল এবং বিশেষ প্রযুক্তির ডিভাইস ব্যবহার করে পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন, পরীক্ষা চলাকালীন কক্ষের বাইরে গিয়ে ইমেইল করা, লিখিত পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে খসড়া তালিকায় বাদ পড়েও মেধা তালিকায় প্রথম, বিধিবহির্ভূতভাবে ইউএনও'র কার্যালয়ে কর্মরত এক কর্মকর্তার স্ত্রীকে মেধা তালিকায় এক নম্বরে রাখাসহ ফ্যামিলি কার্ড শুমারির জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে নানা অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে।
এমনকি বিএনপি নেতাদের মনরক্ষা করতে গিয়ে রাতারাতি ফলাফলের চুড়ান্ত তালিকা বদলে ফেলা হয়েছে, এমন অভিযোগ এখন অনেকটা প্রকাশ্যে। গত কয়েকদিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ধরনের অভিযোগ সম্বলিত পোস্টে সয়লাব হয়ে গেছে। নিয়োগ প্রত্যাশিরা মেধা তালিকায় থাকলেও তাদের কোন কারণে বাদ দেয়া হয়েছে, নেতাদের সন্তান-স্বজনরা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলেও কিভাবে তাদের নাম ফের চুড়ান্ত তালিকায় এসেছে, কৃতকার্যদের কোন প্রক্রিয়ায় বাদ দেয়া হয়েছে, উপজেলা প্রশাসনের উদ্দেশ্যে এমন একগাদা প্রশ্ন ছুড়ে দেয়া হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে। কমেন্ট বক্সেও চলছে পক্ষে-বিপক্ষে নানা তর্ক-বিতর্ক। হুমকির ঘটনার মতো ঘটনাও ঘটছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে। শুমারি করতে গেলে পেটানো হবে বলেও গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ওয়ালে পোস্ট করেছেন আক্তারুজ্জামান সাগর সরকার নামের এক ব্যাক্তি। শুমারির কাজে তার গ্রামে কোনো তথ্য সংগ্রহকারী গেলে পিটিয়ে গ্রামছাড়া করে দেয়ার হুমকিও দেয়া হয় তার ওই পোস্টে।
দুর্গাপুর উপজেলায় ৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা রয়েছে। এই ৮ ইউনিটে নানা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হওয়ায় কয়েকবার পরীক্ষার সময় পরিবর্তন নিয়ে অনেক আগে থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে সরকার দলীয় বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের। আদৌতে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন বললেও এখনো তালিকায় কাটছাঁট চলছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। নিয়োগ বঞ্চিতরা প্রায় দিনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়োগে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ ও অনিয়ম-দূর্ণীতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে বলেও দাবি করে পোস্ট করছেন। এর ফলে সৃষ্ট জটিলতা দ্রুত নিরসনের উদ্যোগ নেয়া না হল অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে এমন শঙ্কায় আছেন উপজেলা প্রশাসন ও সরকার দলীয় নেতারা।
রাজশাহীর অন্যান্য উপজেলায় ইউএন'র বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল, কার্যালয় ঘেরাও করার ঘটনা ঘটলেও এই উপজেলায় এমন ঘটনা এখন পর্যন্ত ঘটেনি। তবে, বহুল প্রত্যাশিত ও কাঙ্খিত নিয়োগে নিজনিজ অনুগত কর্মী-সমর্থক ও তৃণমুলের নেতাকর্মীদের টানতে না পারায় বিএনপির প্রথম সারির নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ তোপের মুখে পড়ছেন প্রতিনিয়ত। বিচ্ছিন্ন এসব ঘটনার কারণে যেকোনো সময় ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নিয়োগ প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত উপজেলা প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা ও সরকার দলীয় নেতারা।
লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়েও নিয়োগ বঞ্চিত কয়েকজন অভিযোগ করেন, পরীক্ষার দিন কক্ষে পরীক্ষা চলাকালীন নানা ধরনের অনিয়ম ও অসদুপায় অবলম্বনের ঘটনা ঘটেছে। বিএনপি নেতার সন্তান ও নিকটাত্মীয়ের কক্ষে দায়িত্বরত পরীক্ষকদের আগেই সাবধান করে দেয়া হয়। যাতে অনৈতিক সুবিধার আশ্রয় নিলেও বাধা দেয়া না হয়। অন্যান্য নিয়োগ প্রত্যাশিরা পরীক্ষকদের অভিযোগ দিলেও তারা আমলেই নেননি। পরীক্ষায় অংশ নেয়া একাধিক নিয়োগ প্রত্যাশি একযোগে প্রতিবাদ শুরু করলে পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিলেও বস্তুত কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
নিয়োগ প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন এমন অন্তত দু'জন ব্যাক্তি, বাদ পড়া একাধিক নিয়োগ প্রত্যাশি, লিখিত পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়ে মেধা তালিকায় এক নম্বরে থাকলেও অজ্ঞাত কারণে চুড়ান্ত তালিকায় বাদ পড়া কয়েকজন নিয়োগ প্রত্যাশি, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নিয়োগ প্রত্যাশিদের আবেদনে উল্লেখিত তথ্যাদি যাচাই-বাছাই ও গোপনীয় প্রতিবেদন প্রেরণে বিভিন্ন সংস্থার দেয়া প্রতিবেদন এবং কয়েকজন কর্মকর্তার সাথে কথা বলে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। এসব তথ্য-উপাত্তের কিছু দালিলিক প্রমাণ ইতোমধ্যে এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
চুড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের একটি তালিকা প্রাথমিকভাবে যাচাই-বাছাই ও গোপনীয় প্রতিবেদনের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কাছে সরকারি আদেশেই প্রেরণ করা হয়। প্রেরিত ওই তালিকায় মেধাক্রম অনুযায়ী তালিকা প্রস্তুত করার সময়েও যে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি করা হয়েছে তার স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। ওই তালিকায় দেখা যায়, ইউএনও অফিসে কর্মরত এক কর্মকর্তার স্ত্রী, বিএনপি নেতাদের সন্তান-স্বজন, নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী যেমন ঠাঁই পেয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক পদ-পদবীর প্রভাবে হুমকি-ধমকি দিয়ে লিখিত পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা ছাত্রদলের এক নেতারও ঠাঁই মিলেছে চুড়ান্ত তালিকার প্রথমস্থানে। শুধু তাই নয়, প্রায় ১০ বছর আগে রাজশাহী নগরীতে বিয়ে হয়ে যাওয়া পৌর বিএনপির প্রথমসারির এক নেতার কন্যাকেও এই তালিকায় রাখা হয়েছে। ছাত্রলীগের কর্মীদেরকেও অদৃশ্য সুপারিশে চুড়ান্ত তালিকায় রাখা হয়েছে বলেও সরগরম উপজেলার রাজনৈতিক অঙ্গন।
শুনতে কিছুটা অবিশ্বাস্য মনে হলেও রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার ৭ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহে অস্থায়ী জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এমন তুঘলকিকান্ড ঘটেছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মেধাক্রম অনুযায়ী লিখিত পরীক্ষায় কৃতকার্যদের অকৃতকার্য দেখাতে এবং অকৃতকার্যদের কৃতকার্য দেখাতে ওভাররাইটিং, নম্বর টেম্পারিংসহ নানা অনিয়ম উঠে এসেছে রাষ্ট্রীয় একাধিক সংস্থার যাচাই-বাছাইয়ে। রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সংক্রান্ত গঠিত কমিটির সদস্যদের রাজনৈতিক নেতাদের প্রেরিত তালিকাটিকেই চুড়ান্ত তালিকা হিসেবে প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পুলিশের বিশেষ শাখা ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার ওই গোপনীয় প্রতিবেদন আমলেই নেননি উপজেলা প্রশাসন।
এদিকে, চুড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্লাটফর্মে চাঞ্চল্যকর ও স্পর্শকাতর অভিযোগ তুলে ধরে পোস্ট করতে থাকেন খোদ সরকার দলীয় নেতাকর্মী, যুব ও ছাত্র সংগঠনের বঞ্চিত নেতাকর্মী-সমর্থকরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পোস্টে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী পরিবারের সদস্য, নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও চুড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। এছাড়াও চূড়ান্ত ও অপেক্ষমাণ তালিকায় একই ব্যক্তির নাম একাধিকবার রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সরকারি চাকুরীতে কোটা প্রথা বিলুপ্ত করে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও মূল্যায়নের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে অবস্থান, পরবর্তীতে আন্দোলন, পুলিশের আগ্রাসী ভুমিকা, সরকারের ছাত্র সংগঠনের বেধড়ক মারপিট-হামলা, সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের একাত্মতা ঘোষণা করা সহ নানাভাবে ‘কোটা না মেধা’ স্লোগানে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে প্রকম্পিত হওয়া ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অবশেষে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা শাসনামলের অবসান ঘটে। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নেন প্রতিবেশী দেশ ভারতে। যদিও তার আওয়ামী সরকারের শাসনামলের অবসান, শেখ হাসিনার পদত্যাগ, ভারতে আশ্রয় গ্রহণ বিষয়ে দেশে-প্রবাসে পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তিতর্ক উঠেছে বিভিন্ন সময়। বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিকভাবেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে চলছে নানা দেনদরবার। এরই মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে সরকার গঠণ করেছে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি। তার আগে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার প্রয়াণে দেশে ফিরে দলের হাল ধরেন তারেক রহমান। শিক্ষার্থীদের যে আন্দোলনের সূত্রপাত ছিলো কোটা না মেধা সেখানে বিএনপি সরকার গঠনের ৬ মাসেই মেধার অপমৃত্যু ঘটিয়েছে এমন অভিযোগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের।
শিক্ষার্থীদের আরও অভিযোগ, যে আন্দোলনের খুঁটির উপর ভর করে বিএনপি সরকার গঠণ করেছে। সেই সরকার সামান্য একটি শুমারির জরিপকাজে যে ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও প্রতিনিয়ত ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটাচ্ছে তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এমন ঘটনা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতারণার শামিল। অথচ এই শুমারির জরিপ কাজে নিয়োজিত হতে পারলে অসংখ্য গরীব মেধাবী শিক্ষার্থীরা কিছুটা হলেও লেখাপড়ার খরচ যোগান করতে পারতেন। কিন্তু বিএনপি সরকার শিক্ষার্থীদের সেই অধিকারটুকুও শুধু হরণ নয়, ছিনতাই করেছে বলেও অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
গত রোববার (৯ আগস্ট) সন্ধ্যায় উপজেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফ্যামিলি কার্ড শুমারি জরিপ কাজে নিয়োজিতদের নিয়োগ পরীক্ষার চূড়ান্ত ও অপেক্ষমাণ তালিকা প্রকাশের পর ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়। কে কিভাবে নিয়োগ পেয়েছে, কার সুপারিশে কে চূড়ান্তভাবে মনোনীত হয়েছে এই ধরনের নানা অভিযোগ তুলে ক্ষমতাসীন সরকারের যুব ও ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরাই একে একে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে থাকে। এরপর নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম,স্বজনপ্রীতি, ওভাররাইটিং, নম্বর টেম্পারিং, চুড়ান্ত তালিকায় ঘষামাজাসহ নানা তুঘলকিকান্ডের অভিযোগ তুলে পোস্ট দিতেও দেখা যায়। যার একাধিক স্ক্রিনশট এই প্রতিবেদক সংগ্রহ করেছে।
নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানায়, সুপারভাইজার পদে চুড়ান্ত তালিকায় মনোনীত ৮ জনের মধ্যে দুইজন সরাসরি রাজনৈতিক পদ-পদবীর পরিচয়ে সরাসরি সুবিধাভোগী। বাঁকি ৬ জন বিশেষ তদবিরে হলেও তাদের মধ্যে ৩ জন আওয়ামী লীগ সমর্থিত পরিবারের সদস্য।
রাজনৈতিক পরিচয়ে চুড়ান্ত মনোনীত পৌরসভা এলাকায় সুপারভাইজার পদে ছাত্রদল নেতা ও জুলাই যোদ্ধা নাসির উদ্দিন বিদ্যুৎ এবং দেলুয়াবাড়ী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুস সাত্তারের ছেলে রবিন উদ্দিন।
অদৃশ্য শক্তি বা বিশেষ বিবেচনায় চুড়ান্ত তালিকায় ঠাঁই পাওয়া অন্য ৩ জন সুপারভাইজার হলো- নওপাড়া ইউনিয়নে শেখ ইমতিয়াজ আহম্মেদ। ঝালুকা ইউনিয়নে শাকিব উদ্দিন ও মাড়িয়া ইউনিয়নে আশরাফুল ইসলাম।
অপরদিকে, আওয়ামী রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত পরিবারের সদস্য যে ৩ জনের নাম এসেছে তারা হলো- পানানগর ইউনিয়নে লিলি খাতুন, কিসমত গনকৈড় ইউনিয়নে নাসির উদ্দিন এবং জয়নগর ইউনিয়নে চুড়ান্ত তালিকায় মনোনীত হওয়া নাহিদ হাসান।
বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মী ও নিয়োগ বঞ্চিতরা অভিযোগ করেন, এই ৩ জনই মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন এমনটা কিভাবে হয়! তারা তো আওয়ামী পরিবারের সদস্য। তবে ওই ৩ জনের পরিবার ছাড়া তাদের রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ততা কিংবা দলীয় পদ-পদবীতে থাকার বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে আমলযোগ্য কোনো তথ্য নিশ্চিত করেনি অভিযোগকারীরা।
তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে চুড়ান্ত তালিকায় ঠাঁই পাওয়া ৮৫ জনের তালিকাতেও রাজনৈতিক পরিচয় ও স্বজনপ্রীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও ইউএনও'র কার্যালয়ের সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা রাতুল ইসলামের স্ত্রী মাসুমা খাতুনকে সুপারভাইজার পদে তালিকার প্রথম স্থানে রাখা হয়। পরে অবশ্য এই বিষয় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে ওই সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রীকে বাদ দিয়ে সেখানে এক ছাত্রদল নেতার নাম ঢুকিয়ে দেয়া হয়। যদিও সেখানে এক নম্বরে থাকার কথা ছিলো মামুনুর রশীদ মামুন নামের এক যুবকের।
অভিযোগকারীদের দাবি, তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে লোকবলের সংখ্যা বেশি। ফলে এই পদে চুড়ান্ত তালিকায় মনোনীত অনেকেই আওয়ামী রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত এবং পরিবারের সদস্য।
এদিকে, তথ্য সংগ্রহকারী পদে চুড়ান্ত তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে দুর্গাপুর পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি আব্দুল আজিজ মন্ডলের মেয়ে সাদিয়া নাজনীন। এই বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে ছাত্রদলের এক নেতা ফেসবুক পোস্টে বিএনপি নেতা আব্দুল আজিজ মন্ডলের তীব্র সমালোচনা করেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিএনপির এই নেতার একমাত্র কন্যার প্রায় ১০ বছর আগে বিয়ে হয়ে গেছে রাজশাহী নগরীতে।
জয়নগর ইউনিয়নের তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে চুড়ান্ত তালিকায় আওয়ামী লীগ সমর্থক আলো নাজনীন মনোনীত হয়েছেন। তার পুরো পরিবার আওয়ামী রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন।এছাড়াও অপেক্ষমাণ তালিকায় নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ কর্মী তোফাজ্জল হোসেনের নামও রয়েছে। এই তালিকায় শ্যামলী খাতুন নামের এক শিক্ষার্থীর নাম দুই জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছে।
অন্যদিকে, নওপাড়া ইউনিয়নে মিজানুর রহমান নামে একজন মৌখিক পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পানানগর ইউনিয়নে চুড়ান্ত তালিকায় আওয়ামী পরিবারের জেনিফা আক্তার ও সৈকত ইসলাম এবং অপেক্ষামান তালিকায় শিউলি বেগমের নাম চুড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে গোপনীয় প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব অনিয়মের বিষয়ে বঞ্চিত ও স্থানীয়দের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা গেছে।
নওপাড়া ইউনিয়নের যুবদল নেতা বাচ্চু মিয়া তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘যেগুলোর নাম প্রকাশিত হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই সুপারিশপ্রাপ্ত।’ অন্য এক মন্তব্যে তিনি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সমাজসেবা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। তার এসব পোস্টে নিয়োগে বঞ্চিত একাধিক পরীক্ষার্থীও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
কিসমতগনকৈড় ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মুশফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষা ভালো দেওয়ার পরও তিনি নির্বাচিত হননি। অথচ আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচিত নাসরিন খাতুন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের সুপারিশে নির্বাচিত হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
পানানগর ইউনিয়নে সুপারভাইজার পদে নির্বাচিত লিলি খাতুনকে আওয়ামী লীগ সমর্থিত পরিবারের সদস্য দাবি করে স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি কর্মী-সমর্থক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নিয়োগে বাদ পড়া রায়হান বাবু ও বিএনপি পরিবারের সন্তান হিসেবে পরিচিত জহুরুল ইসলাম তাদের ফেসবুক পোস্টে লিলি খাতুনের নাম উল্লেখ করে ফলাফলের স্ক্রিনশট প্রকাশ করেন। সেখানে তারা নিয়োগের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
জয়নগর ইউনিয়নে সুপারভাইজার পদে নির্বাচিত নাহিদ হাসানকেও আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য দাবি করেছেন কয়েকজন নিয়োগে বঞ্চিত পরীক্ষার্থী। নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে অভিযোগ করেন- উপজেলা বিএনপির এক দায়িত্বশীল নেতার সুপারিশে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন।
দুর্গাপুর পৌর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সাইদুর রহমান সুপারভাইজার পদে নির্বাচিত না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি দুইবার ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। যারা সুপারভাইজার পদে নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের সঙ্গে আমিও একই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছি। ফলাফল, যোগ্যতা ও রাজনৈতিক বিবেচনায় আমি এগিয়ে থাকার পরও কেন বাদ পড়লাম, এই প্রশ্নের উত্তর চাই?।’
তিনি আরও বলেন, ‘চূড়ান্ত তালিকায় যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে আমাদের প্রশ্ন রয়েছে। নিয়োগ কমিটির সভাপতি ইউএনও উম্মে হাবিবা ফারজানা ও সদস্য সচিব উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আ.ন.ম. রাকিবুল ইউসুফ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কতটুকু স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছেন, সেটি নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা ছাত্রদলের দায়িত্বশীল এক নেতা বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই প্রকল্পে যদি আওয়ামী পরিবারের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে তারা কতটা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করবেন, তা আমার বোধগম্য নয়! বিএনপির কিছু নেতা দলকে বিতর্কিত করতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রত্যয়ন দিয়ে আসছেন। একইভাবে তারা এই নিয়োগেও আওয়ামী সমর্থিত পরিবারের সদস্যদের নিয়োগ নিশ্চিত করেছেন বলেও ওই নেতা দাবি করেন।’
শুমারিতে নিয়োগ প্রত্যাশিদের বেশি অংশই শিক্ষার্থী। শুমারির কাজে অংশ নিলে যে ভাতা পাওয়া যেতো তাতে লেখাপড়ার কিছুটা খরচ যোগান হতো। বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক নেতা ও উপজেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ কেউ লিখেছেন, এই ধরনের শুমারির নিয়োগেও যদি রাজনৈতিক তদবির-সুপারিশই প্রাধান্য পায়, তবে লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষার নামে গরীব সাধারণ শিক্ষার্থীদের অর্থ-সময় নষ্ট করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। এই ধরনের শুমারিতেও দলীয় নেতাদের যে আধিপত্য বিস্তার দেখা গেলো তাতে আগামীতে তারা কি করবেন তা সহজেই অনুমেয়। সরকার দলীয় নেতাকর্মীরা এবং উপজেলা প্রশাসন শিক্ষার্থীদের সাথে যা করলেন তাতে নিয়োগের নামে শিক্ষার্থীদের সাথে এইটা তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়।
নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আ.ন.ম. রাকিবুল ইউসুফ দাবি করেন, নিয়ম অনুযায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। চুড়ান্ত তালিকায় নির্বাচিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাৎক্ষনিক তাকে বাদ দেয়াও হবে।
ফ্যামিলি কার্ড শুমারি কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে হাবিবা ফারজানা বলেন, সরকারি বিধি অনুযায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। কোনো ধরনের দলীয় তদবির ছাড়াই মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রার্থী নির্বাচন করা হয়েছে। তবে নির্বাচিতদের মধ্যে কেউ বিতর্কিত বা অযোগ্য প্রমাণিত হলে কিংবা অভিযোগ পেলে যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে তার নিয়োগ বাতিল করা হবে।