স্টাফ রিপোর্টার, দুর্গাপুর : ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানির পশু জবাই ও চামড়া সংরক্ষণ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির নামে প্রশিক্ষনার্থীদের যাতায়াত বাবদ বরাদ্দকৃত অর্থের এক তৃতীয়াংশ আত্মসাৎ ও চামড়া সংরক্ষণ করতে সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত লবণ বিতরণে নয়ছয় করার অভিযোগ উঠেছে রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে।
গত ২৩ মে বিকেলে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে মিনি হলরুমে কোরবানির পশু যথা নিয়মে জবাই ও পশুর চামড়া সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে প্রশিক্ষণ কর্মসূচীর আয়োজন করা হয়। সরকারি নির্দেশনায় এবার প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে মাদ্রাসার ছাত্রদের অগ্রাধিকার দিতে সুস্পষ্টভাবে বলা হলেও ছাত্রদের প্রশিক্ষণে না ডেকে মাদ্রাসার মুহতারিম বা শিক্ষকদের ডাকা হয়। দেড় থেকে দুই ঘন্টার ওই প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে উপজেলা ও পৌর এলাকার হাফেজিয়া এবং কওমী মাদ্রাসার মাত্র ১০ থেকে ১২ জন শিক্ষক অংশ নিলেও হাজিরা সীটে প্রশিক্ষনার্থীদের উপস্থিতি দেখানো হয়েছে তিনগুণ বেশি।
জানা গেছে, গত বছরের মতো এবারও প্রায় ২০ কোটি টাকার লবণ সারাদেশের মসজিদ, মাদরাসা ও এতিমখানায় বিনামূল্যে বিতরণ করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠান গুলো যাতে কোরবানির চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারে এবং ন্যায্য মূল্য পায়।
গত বছর প্রথমবারের মতো এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো। এ বছরেও সরকারের এই উদ্যোগ আরও কার্যকর করতে লবণ বিতরণের পাশাপাশি সঠিক প্রক্রিয়ায় পশুর চামড়া সংরক্ষণে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সংযুক্ত করে প্রশিক্ষনার্থীদের যাতায়াত বাবদ সম্মানি ভাতা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
প্রশিক্ষণের আওতায় উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা প্রশাসন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে মাদরাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোডিং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং পেশাদার কসাইদের চামড়া সংরক্ষণ ও লবণ প্রয়োগের সঠিক পদ্ধতি শেখানো, দক্ষ কসাইদের সম্পৃক্ত করে প্রশিক্ষণ পরিচালনা করে মাঠপর্যায়ে বাস্তব দক্ষতা তৈরি করার উদ্দেশ্যেই মূলত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ বছর প্রায় ২০ কোটি টাকার লবণ জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিতরণ করার নির্দেশনা দেয়া হয়। সঙ্গে যোগ করা হয় প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণে অংশ গ্রহণ। কেননা মাঠের বাস্তবতায় দেখা গেছে, এই ধরনের প্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাই মূলত চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ কাজ করে থাকে। প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা শুধু তদারকি করেন। অনেক রাত অবধি ছাত্ররা এই কাজ করলেও তারা পায়না কোনো পারিশ্রমিক। আবার ছাত্ররা সংরক্ষণ পদ্ধতি না জানার কারনে চামড়া নষ্ট হয়ে যায়।
গত শনিবার উপজেলা পরিষদের মিনি হলরুমে আয়োজিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিদের রাজস্ব ডাকটিকিট সম্বলিত হাজিরা সীটে স্বাক্ষর নিয়ে প্রত্যেককে ৩০০ টাকা হারে সম্মানি ভাতা দেয়া হয়। প্রশিক্ষণ অংশ নেননি এমন কয়েকজনের কাছ থেকেও স্বাক্ষর নেয়া হয়। তবে তাদের সম্মানি ভাতা দেয়া হয়নি।
দুর্গাপুর জামিউল উলুম কওমী মাদ্রাসার কিতাব বিভাগের শিক্ষক আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, প্রতিষ্ঠান প্রধানের সাথে তিনিও ওই প্রশিক্ষণ কর্মসূচীতে অংশ নিতে উপজেলায় গিয়েছিলেন। প্রশিক্ষণ শেষে রাজস্ব ডাকটিকিট সম্বলিত হাজিরা সীটে (মাস্টার রোল) তার স্বাক্ষর নেয়া হলেও তাকে কোনো ভাতা দেয়া হয়নি। পরে তিনি ভাতা প্রদানের বিষয়টি জেনেছেন। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করার ইচ্ছা পোষণ করলেও মাত্র ৩০০ টাকার জন্য প্রশ্ন করা কেমন হবে, এইভেবে লোকলজ্জার কারণে তিনি আর প্রশ্ন করেননি। ভাতা না নিয়েই তিনি উপজেলা চত্বর থেকে চলে যান।
আব্দুল ওয়াহেদের মতো বেশ কয়েকজন ব্যাক্তি একই তথ্য নিশ্চিত করেছেন এবং স্বাক্ষর নেয়া হলেও সম্মানি ভাতা পাননি বলে জানান।
প্রশিক্ষণ কর্মসূচী চলাকালীন কয়েকটি স্থিরচিত্র ও ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, উপজেলা পরিষদের মিনি হলরুমে আয়োজিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচীতে ১০ থেকে ১২ জন ব্যাক্তি রয়েছেন। আর প্রশিক্ষক হিসেবে ইউএনও মাশতুরা আমিনা, উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস, দুর্গাপুর থানার ওসি পঞ্চনন্দ সরকার ও ইসলামী ফাউন্ডেশনের একজন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
বরাদ্দকৃত ৫০ হাজার টাকার আয়কর-ভ্যাট বাবদ বাদ দিলে টাকার অংক দাঁড়ায় প্রায় ৪০ হাজারের উপরে। সেখান থেকে মাত্র ১৫ হাজার টাকা সার্টিফিকেট সহকারী আব্দুস সোবাহানের হাতে বুঝিয়ে দেন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক রাজু আহম্মেদ।
সার্টিফিকেট সহকারী আব্দুস সোবাহান ১৫ হাজার টাকা গ্রহনের কথা স্বীকার করলেও প্রশিক্ষণ কর্মসূচীতে ৩০/৩৫ জন উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করেন। আব্দুস সোবাহানের দাবি অনুযায়ী ৩৫ জনের প্রত্যেককে ৩০০ টাকা হারে দেয়া হলেও ১০ হাজার ৫০০ টাকা হয়। অবশিষ্ট টাকা কি করেছেন? এমন প্রশ্ন করা হলে আব্দুস সোবাহান কোনো সদুত্তর না দিয়ে উপজেলায় গিয়ে ইউএনও'র সাথে কথা বলতে বলেন। এরপরই তিনি বাইক চালাচ্ছেন জানিয়ে পরে কথা বলতে চেয়ে ফোনকলের সংযোগ কেটে দেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই প্রশিক্ষণে অংশ নেয়া একাধিক ব্যাক্তি জানান, “আমাদের স্বাক্ষর নেয়া হয়েছে, কিন্তু কোনো সম্মানি ভাতা দেয়া হয়নি। পরে জানতে পারি বরাদ্দ ছিল ৫০ হাজার টাকা।” তাদের দাবি, নামকাওয়াস্তে নাস্তাসহ পুরো আয়োজনে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ করা হয়েছে। উদ্বৃত্ত টাকা উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছেন।
এদিকে, কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ করতে এই উপজেলায় ১২ দশমিক ৭৫ মেট্রিকটন লবণ বরাদ্দ দেয়া হয়। এই লবণ বিতরণেও অনিয়ম করা হয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠানে মাত্র ১৫ বস্তা লবণ দিয়ে ওই নামে ৪০ বস্তা লবণ বিতরণ দেখানো হয়েছে। গণমাধ্যমকর্মীরা এই বিষয়টি জানতে পেরে ইউএনও মাশতুরা আমিনাকে অবহিত করলে তিনি প্রথমে জোর গলায় দাবি করেন কোথাও কোনো অনিয়ম হয়নি। তবে ইনিয়ে-বিনিয়ে প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং গণমাধ্যমকর্মীদের ঈদের দাওয়াত দেন। এমনকি এই ধরনের অভিযোগ কে দিয়েছে তাকে ধরে উপজেলায় নিয়ে যেতে বলেন।
মজার বিষয় হলো- ইউএনও মাশতুরা আমিনা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করলেও সম্মানি ভাতা বিতরণ ও লবণ বিতরণ সংক্রান্ত ঘটনার অনিয়ম এবং নয়ছয়ের সমস্ত দলিল দস্তাবেজ গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে সংরক্ষিত আছে এমন আন্দাজ করতে পেরে রোববার সন্ধ্যার দিকে ফের প্রশিক্ষণে অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিরদের অফিসে ডেকে নিয়ে পূণরায় নতুন হাজিরা সীটে (মাস্টার রোল) স্বাক্ষর নেন। অথচ আগের দিন শনিবার বিকেলেই প্রশিক্ষণ হয়ে গেছে। এছাড়া লবণ বিতরণ কার্যক্রম ছিলো শেষ পর্যায়ে। তবে কয়েক বস্তা লবণ বিতরণ দেখানো হলেও বেশির ভাগ লবণ বাইরে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে, লবণের মান নিয়েও অসন্তোষ দেখা গেছে। সরকারিভাবে যে লবণ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তা অত্যন্ত নিম্নমানের। এই ধরনের লবণ চামড়ায় ব্যবহার করা হলে চামড়া সংরক্ষণ তো দুরের কথা, ওই চামড়া কোথাও বিক্রি করা যাবেনা।
কয়েকটি মাদ্রাসা সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোরবানির দিন বিকেল থেকে চামড়া আসতে থাকে। অনেক জায়গায় গিয়েও তাদের চামড়া সংগ্রহ করতে হয়। এতে অনেক রাত হয়ে যায়। মৌসুমি ব্যাপারি অথবা চামড়ার আড়তদারের লোকজন ওই রাতেই দরদাম সাপেক্ষে চামড়া নিয়ে চলে যান। ফলে মাদরাসার বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে বরাদ্দ দেয়া লবণ ব্যবহার করাই হয়না। সেক্ষেত্রে লবণ বাইরে বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে ব্যয় করা হয়। কিন্তু এবারের লবণ অত্যন্ত নিম্নমানের হওয়ায় বাইরে বিক্রি করতে পারবেন কিনা তা নিয়ে দ্বিধায় পড়েছেন প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিরা।
রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহা. সবুর আলী স্বাক্ষরিত লবণ বরাদ্দ সংক্রান্ত পত্রে দেখা গেছে, চট্টগ্রামের মেসার্স আল্লাই সল্ট ক্রাশিং এন্ড রিফানারীজ ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে লবণ সরবরাহ করা হয়েছে। রাজশাহী সদর ও ৯ উপজেলায় বিতরণের জন্য পাঠানো হয়েছে। তবে অত্যন্ত নিম্নমানের ও ব্যবহার অনুপযোগী লবণ নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েছেন প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিরা।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাশুতুরা আমিনা বলেন, প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দের বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।