বিনামূল্যের ডাস্টবিন বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ, নেই তদারকি-উধাও ১৯৪ বড় ও ১,৪৭৪ ছোট ডাস্টবিন
নিজস্ব প্রতিবেদক, চারঘাট: রাজশাহীর চারঘাট পৌরসভায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে দেওয়া ৪ হাজার ছোট ও ৪০০ বড় ডাস্টবিনের মধ্যে ১ হাজার ৬৬৮টির কোনো হদিস মিলছে না। পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, বড় ডাস্টবিন ২০৬টি এবং ছোট ডাস্টবিন ৯৯২টি বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে পৌরসভায় বড় ডাস্টবিন একটিও নেই এবং ছোট ডাস্টবিন রয়েছে ১ হাজার ৫৩৪টি।
হিসাব অনুযায়ী, ৪০০ বড় ডাস্টবিনের মধ্যে ২০৬টি বিতরণের পর পৌরসভায় থাকার কথা ১৯৪টি। কিন্তু এর একটিও পাওয়া যাচ্ছে না। একইভাবে ৪ হাজার ছোট ডাস্টবিনের মধ্যে ৯৯২টি বিতরণের পর অবশিষ্ট থাকার কথা ৩ হাজার ৮টি। বর্তমানে রয়েছে ১ হাজার ৫৩৪টি। অর্থাৎ ১ হাজার ৪৭৪টি ছোট ডাস্টবিনেরও হিসাব নেই। সব মিলিয়ে ১ হাজার ৬৬৮টি ডাস্টবিনের হদিস মিলছে না।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (আইইউজিআইপি) আওতায় চারঘাট পৌরসভায় বাসাবাড়ির জন্য ২০ লিটারের ৪ হাজার এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ১২০ লিটারের ৪০০ ডাস্টবিন দেওয়া হয়। এসব ডাস্টবিন পৌরবাসীর মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণের কথা ছিল। তবে অভিযোগ উঠেছে, ছোট ডাস্টবিনের জন্য ১০০ টাকা এবং বড় ডাস্টবিনের জন্য ৩০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়ম মেনে যারা ডাস্টবিন নিয়েছেন তাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হলেও প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের অনেকেই বিনা মূল্যে ডাস্টবিন নিয়ে গেছেন। এমনকি পৌর এলাকার বাইরের বিভিন্ন ব্যক্তিও ডাস্টবিন পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নাগরিকদের ব্যবহারের জন্য দেওয়া অনেক ডাস্টবিন পড়ে আছে ময়লার ভাগাড়ে। কোথাও ডাস্টবিন অব্যবহৃত, আবার কোথাও ডাস্টবিনের চারপাশেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে আবর্জনা। নিয়ম অনুযায়ী এসব ডাস্টবিন থেকে পৌরসভার গাড়িতে করে বর্জ্য সংগ্রহ করার কথা থাকলেও বাস্তবে ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঘাটতি দেখা গেছে।
পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, বিতরণ করা ডাস্টবিন থেকে বর্জ্য সংগ্রহ বাবদ মাসে প্রায় ২৫ হাজার টাকা আয় হচ্ছে। ফলে ডাস্টবিনগুলো সঠিকভাবে বিতরণ ও ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা গেলে একদিকে নাগরিকদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সুবিধা বাড়ত, অন্যদিকে পৌরসভার আয়ও বৃদ্ধি পেত।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, ডাস্টবিন বিতরণে কার্যকর কোনো তদারকি ব্যবস্থা ছিল না। পৌরসভার একটি প্রভাবশালী চক্র নিজেদের ইচ্ছেমতো বিভিন্ন ব্যক্তিকে ডাস্টবিন দিয়েছে। এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও পৌরসভা থেকে ডাস্টবিন নিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে পৌরসভার সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল করিমের সময়ে ডাস্টবিনগুলো বরাদ্দ আসে। অভিযোগ রয়েছে, ডাস্টবিনের ফাইলপত্র তার কাছেই ছিল এবং বিতরণের ক্ষেত্রে লিখিত হিসাব যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল করিম।
তিনি বলেন, ‘আমি কোনো ফাইল নষ্ট করিনি। রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশে দু-চারটি ডাস্টবিন বিতরণ হয়েছে। এছাড়া সবগুলোরই খাতা মেইনটেইন করা হয়েছে।’
চারঘাটের নিমপাড়া ইউনিয়নের নন্দনগাছী বাজারের একটি ওষুধের দোকানে পৌরসভার ডাস্টবিন ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। দোকানি নজরুল ইসলাম বলেন, ‘পৌরসভার সবার সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক। সরকারি ডাস্টবিনগুলো দেখতে সুন্দর, এজন্য দুইটা নিয়ে এসেছি। কোনো টাকা-পয়সাও লাগেনি।’
এ ছাড়া কিছু ডাস্টবিন নিয়ে গিয়ে ভেঙে প্লাস্টিকের অংশ ভাঙারির দোকানে কেজি দরে বিক্রি করার অভিযোগও রয়েছে। ডাস্টবিন বিতরণ ও সংরক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি না থাকায় কার্যকর জবাবদিহি নেই বলেও অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
চারঘাট পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম রায়হান বলেন, ‘ডাস্টবিনের বিষয়ে পৌরসভার কোনো তদারকি নেই। বিভিন্ন মাদকাসক্ত ব্যক্তি পৌরসভা থেকে ডাস্টবিন এনে ভাঙারির দোকানে বিক্রি করে মাদক সেবন করছে। কিন্তু তাদের বাধা দেওয়ার মতো কেউ নেই।’
৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সেলিম রেজা বলেন, ‘ডাস্টবিনগুলো বিনামূল্যে দেওয়ার কথা। এগুলো পৌরসভার নাগরিকরা ব্যবহার করলে মাস শেষে ময়লা সংগ্রহের জন্য পৌরসভা ফি নিতে পারত। কিন্তু ইউনিয়ন পর্যায়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ডাস্টবিন নিয়ে বাড়িতে চলে যাচ্ছেন।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চারঘাট উপজেলা শাখার সভাপতি মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি ও রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ এই পৌরসভার আওতায় হওয়ায় এর আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। পৌরবাসীকে সচেতন করা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মানোন্নয়নের জন্য ডাস্টবিনগুলো দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পৌর কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনায় প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছে।’
চারঘাট পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মজিবর রহমান বলেন, ‘প্রকল্প থেকে পৌরসভায় কতটি ডাস্টবিন দেওয়া হয়েছিল, সেটিও আমার জানা নেই। এ কারণে কতটির হদিস নেই, সেটাও বলতে পারছি না। ডাস্টবিনের ফাইল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পুরো পৌরসভা তন্ন তন্ন করে খুঁজেও ফাইল পাওয়া যায়নি।’
এ বিষয়ে চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
চারঘাট পৌরসভা আইইউজিআইপি প্রকল্পের আওতাভুক্ত দেশের ১০টি গুরুত্বপূর্ণ পৌরসভার একটি। এ প্রকল্পের মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে বিভিন্ন পৌরসভায় ডাস্টবিনসহ নানা অবকাঠামোগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) অর্থায়ন করছে এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বাস্তবায়ন ও তদারকির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।