
নিজস্ব প্রতিনিধি: সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। ছবি: সংগৃহীত
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনীর ১ লাখ সদস্য দায়িত্ব পালন করবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
বুধবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে চট্টগ্রাম বিভাগের সব জেলা প্রশাসক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের পর সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। মতবিনিময়ে আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা, জাতীয় সংসদ নির্বাচন, মাদক প্রতিরোধ ও অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান উপদেষ্টা।
মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, নির্বাচন শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করে না, জনগণের ভূমিকা এখানে মুখ্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি খুব ভালো। তাদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়ে গেছে। তাদের সংখ্যা আমরা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছি। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী সবাই কিন্তু এবার ইলেকশনে থাকবে। এখন মাঠে ৩০ হাজারের মতো সেনাবাহিনী আছে। ওই সময় কিন্তু ১ লাখের মতো সেনাবাহিনী থাকবে, নেভি থাকবে, এয়ারফোর্স থাকবে। আর আমাদের তো পুলিশ আছেই। বিজিবি আছে, আনসার আছে, কোস্টগার্ড আছে, র্যাব আছে, সর্বোপরি প্রশাসন তো রয়ে গেছে।
নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি জনগণের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, জনগণ হলো এখানে মেইন। জনগণ যদি নির্বাচনের মাঠে নেমে যায়, তাহলে কেউ কিন্তু আর আটকাতে পারবে না। আর রাজনৈতিক দলগুলো তাদের মধ্যে যদি একটা মতৈক্য হয়ে যায়, তাহলে সবার সুবিধা হয়। তারপরে আছে ইলেকশন কমিশন। তারা যে একটা আইন-টাইন করবে এটার ওপর নির্ভর করবে। তারপর প্রশাসন আছে তাদের একটা ভূমিকা নির্ভর করবে। তারপরে হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকতে হবে।
দুর্গাপূজায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রস্তুতি সন্তোষজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২৮ তারিখ থেকে আমাদের শারদীয় দুর্গাপূজা। আলোচনার মাধ্যমে আমরা আশা করছি যে, এবারের দুর্গাপূজাটা খুবই শান্তিপূর্ণ এবং খুবই উৎসবমুখর হবে। কোনো জায়গায় কোনো ধরনের বড় কোনো সমস্যা নেই। এটা শান্তিপূর্ণভাবে এবং উৎসবমুখর হবে। এটা একটা ধর্মীয় উৎসব, এটার পবিত্রতা যেন রক্ষা পায়, ওদিকে সবার খেয়াল রাখতে হবে। যারা এই উদ্যাপনটা করছে তাদের মধ্যে ভাগ ছিল। কেউ বলে দুই ভাগ, কেউ বলে তিন ভাগ। যেহেতু এটা একটা ধর্মীয় উৎসব, তাই এটা পালনের ক্ষেত্রে ভাগ কোনো ধরনের বাধা হবে না। কারণ এটা তাদের জন্য একটা পুণ্য কাজ। এই পুণ্য কাজটা করার জন্য কেউ কোনো ধরনের বাধার সৃষ্টি করবে না। এটা আমরা আশা করি। এটা যেন খুব ভালোভাবে, আমি সব ধর্মের লোকজনদের বলব কো-অপারেট করেন, এটা যেন খুব ভালোভাবে হয়ে যায়। শান্তিপূর্ণভাবে যেন হয়ে যায় এবং ধর্মীয় পবিত্রতাটা রক্ষা করে যেন এটা হয়।
দুর্গাপূজা নিয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো আশঙ্কা দেখছি না। কিন্তু আপনারাও লোকজনকে সজাগ করবেন। এটা যেহেতু একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য্য নিয়ে যাতে এ জিনিসটা হয় এবং এটার পবিত্রতা যেন রক্ষা পায়, সেদিকে আপনারা সজাগ থাকবেন।
গুজব প্রতিরোধে সাংবাদিকদের ভূমিকা প্রয়োজন উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, সর্বোপরি রয়ে গেছেন আপনারা (সাংবাদিক)। আপনারা সত্যি খবরটা যদি দেন, দেখেন প্রথমদিকে আমাদের পার্শবর্তী দেশ কিন্তু অনেক উল্টাপাল্টা খবর দিত। আপনারা কাউন্টার করায়, আপনারা সত্যি খবরটা দেওয়ায়, এখন কিন্তু সেটার সংখ্যা কমে গেছে। পূজা উপলক্ষে কিন্তু তারা আবার করা শুরু করবে। আমি আপনাদের অনুরোধ করব, আপনারা আগে যে ভূমিকাটা পালন করতেন এবারও সেই ভূমিকাটাই পালন করবেন। তাদের কাউন্টার করবেন, জনগণ যেন সত্যি ঘটনাটা পায়। আমি ডিসি-এসপি সবাইকে বলেছি, ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে সত্যি ঘটনাটা যাতে সবাই প্রকাশ করে দেয়। সত্যি ঘটনা প্রকাশ না করলে বিভিন্ন ধরনের গুজব সৃষ্টি হয়।
ইউটিউব ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার নিয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ইউটিউবে যেগুলো দিয়ে দেয়, সেগুলো তো আমরা সরাসরি কিছু করতে পারি না। আমরা রিকুয়েস্ট করতে পারি। দেখা গেছে লোকালি এগুলো বেশি হয়, কিছু কিছু ঘটনা দেখা যাচ্ছে তেমন কিছুই হয়নি, অথচ সেটা মিডিয়ায় চলে আসছে। এগুলো কিন্তু প্রচারও আবার বেশি হয়। এগুলোর ক্ষেত্রে আমাদের সবারই সজাগ থাকতে হবে। সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে। বাহিনীর প্রধানদের আমরা নির্দেশনা দিয়েছি, এই কাজের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা। এজন্য আমি আপনাদেরও সাহায্য-সহযোগিতা চাই। আপনারা পয়েন্ট আউট করে দিলে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসা যাবে।
সারাদেশে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল নিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, অনেককে কিন্তু আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। আইনের আওতায় আনার পরেও অনেকে কিন্তু জামিন পেয়ে যায়। আমরা চেষ্টা করছি, এরা যেন আর সহজে জামিন না পায়। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য।
৫ আগস্ট চট্টগ্রামের থানা থেকে খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, থানা থেকে লুট করা অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের অনেক সফলতা আছে। এরা (পুলিশ) কিন্তু অনেক অস্ত্র উদ্ধার করেছে। তারপরও কিছু কিছু অস্ত্র এখনও বাইরে রয়ে গেছে।
অস্ত্র উদ্ধারে চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, এটা ভৌগোলিকভাবে একটু ডিফারেন্ট। এখানে পাহাড় আছে, সমুদ্রও আছে, প্লেন ল্যান্ডও আছে। অন্য কোনো জায়গায় কিন্তু এভাবে পাহাড়, সমুদ্র প্লেন ল্যান্ড নেই। যেমন- ফটিকছড়ি, রাউজান এসব এলাকায় অর্ধেক পাহাড়, আর অর্ধেক আবার প্লেন ল্যান্ড। চাকরি জীবনে আমি তিনবার এখানে চাকরি করেছি। এ জায়গায় সমস্যাটা আছে। তারপরও কিছু কিছু উদ্ধার হচ্ছে ইলেকশনের আগে আরও উদ্ধার হবে।
মাদক পাচার ও উদ্ধার প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, আপনারা জানেন মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তারা কিন্তু এখন আর বর্ডার এলাকায় নেই। পুরোটা কিন্তু আরাকান আর্মি দখল করে নিয়েছে। এখন মায়ানমার আর্মির সঙ্গে আরাকান আর্মির একটা যুদ্ধ চলছে। এখানে আমাদের আরএসও রয়ে গেছে, আরসা রয়ে গেছে। বাট আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিন্তু ভালো কাজ করছে। পরিস্থিতি মোটামুটি একটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ধরে রেখেছে। তাদের যে ইন্টারনাল সমস্যা, এগুলো অনেকসময় আমাদের ওপর এসে পড়ে। প্রতিবেশীর সমস্যা তো এসে পড়ে।
মিয়ানমারের আরাকান আর্মি মাদকের ওপর বেঁচে আছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রচুর মাদক আসে। আর মাদকের পরিবর্তে আমাদের দেশ থেকে যাচ্ছে চাল-সার, ওষুধপত্র এবং আরও অন্যান্য জিনিস। আমরা আলোচনা করেছি, এগুলো যেন না যেতে পারে। মাদক যেন কোনো অবস্থায় আসতে না পারে। মাদকটা কিন্তু আমাদের পুরো সমাজটা নষ্ট করে দিচ্ছে। দেশের অন্যান্য বেল্ট দিয়ে যে মাদক আসে না, তা নয়। কিন্তু কক্সবাজার দিয়ে সবচেয়ে বেশি আসে। সেজন্য আমরা কক্সবাজারে ধীরে ধীরে ফোর্সের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছি। আশা করি যে, আস্তে আস্তে এটা কমে আসবে। সমস্যাটা কমে আসছে কিন্তু পুরোপুরি রিমুভ হয়নাই।