
জানা যায়, একাত্তরে বিতর্কিত নয় অথবা একাত্তর-পরবর্তী প্রজন্মের ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে জামায়াত নেতারা সমবেত হবেন এই দলে। জামায়াতের একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, আগামী জুন মাসেই ‘ইসলামিক প্রোগ্রেসিভ পার্টি’ (আইপিপি) আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করতে পারে। এর চেয়ারম্যান হতে পারেন দলটির সদ্য পদত্যাগী নেতা ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। প্রায় পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলেছে আইপিপির প্রস্তুতি পর্ব। গঠনতন্ত্র, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নির্ধারণসহ এরই মধ্যে নানা ধরনের কর্মকৌশল ও পন্থা তৈরি করেছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশের পরপরই নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করবেন তারা। সফল না হলে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হবে আইপিপি। তুরস্কের একে পার্টির আদলে আইপিপির কার্যক্রম ও কর্মপন্থা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলটির একজন সমন্বয়ক। নতুন দল গঠনে জামায়াতের তৃণমূলেরও সায় রয়েছে। জামায়াতের একাধিক সূত্র জানায়, যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে জামায়াতের তৃণমূল নেতাকর্মীরা হতাশা প্রকাশ করছেন প্রতিনিয়ত।
এ কারণে প্রশাসনের রোষানলে পড়ে গত ১০ বছর আন্দোলন-সংগ্রামে মামলা-হামলার শিকার দলটির নেতাকর্মীরা মুষড়ে পড়েছেন। তারা মনে করছেন, সাধারণ মানুষের কাছে জামায়াতে ইসলামী নামটি ‘ঘৃণা’য় পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের আশা-আকাক্সক্ষাকে পাশ কাটিয়ে তারা সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াকে বড় বাধা বলে মনে করছেন। যুদ্ধাপরাধী তকমা নিয়ে একটি দেশের রাজনীতিতে এগিয়ে যাওয়া বা প্রতিষ্ঠিত হওয়া যাবে না বলেও তারা মনে করেন। যে বিষয়টি স্বয়ং পদত্যাগী নেতা আব্দুর রাজ্জাকের বক্তব্যেও উঠে এসেছে। এ ছাড়া এ মুহূর্তে কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে দলটির অধিকাংশ নেতাকর্মী অনিচ্ছুক। জামায়াতের প্রতি তৃণমূলের অনাস্থার বিষয়টি মাথায় নিয়ে নতুন দল গঠনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি কাজ শুরু করেছে। দলের নির্বাহী পরিষদের ১৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত অধিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্যদের বিবেচনার জন্য পাঠানো হয়। জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্যদের পাঠানো নির্দেশনার চিঠি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এদিকে নীরবে-নিভৃতে পাঁচ বছর পরিকল্পনা করে একটি দলের আত্মপ্রকাশের পেছনে কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে নানা মহলে। এ বিষয়ে জামায়াতে নিষ্ক্রিয় সিলেটের এক ব্যবসায়ী জানান, নতুন পার্টি নিয়ে এখনো আলোচনা হয়নি। প্রস্তাবনাও আসেনি। তবে ভাবনার পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু সেটা কোনোভাবেই ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক প্লাটফর্ম হবে না। ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের ভেতরে থেকেই সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ও নির্বাচনমুখী একটি সুস্থ রাজনৈতিক ধারাকে বেছে নেয়া হচ্ছে। জামায়াতের আরেকটি সূত্র জানায়, জামায়াতে ইসলামী দলের নামে ভবিষ্যতে আর কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না। শুধু আদর্শিক জায়গা থেকে ধর্মভিত্তিক কর্মকাণ্ড চালাবে দলটি।
অন্যদিকে জামায়াতের আরেকটি সূত্র জানায়, দলটি বিএনপির নেতৃত্বে জোটে আছে ২০ বছরেরও বেশি সময়। তবে এখন জোট থেকেও চূড়ান্তভাবে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জামায়াত। অল্প দিনের মধ্যেই জামায়াত বিএনপি জোট থেকে বেরিয়ে যাবে। বিএনপির কাছে জামায়াত দাবি জানাবে ২০ দলীয় জোট ভেঙে দিতে। আর তা যদি না হয় তাহলে জামায়াত যে জোটে থাকছে না সে ঘোষণা বিএনপির পক্ষ থেকে দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এ বিষয়ে জামায়াতের একটি সূত্র জানায়, জামায়াত ঘোষণা দিয়ে জোট থেকে বের হবে না। বিএনপিও জামায়াতকে জোট ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানাবে না। ধীরে ধীরে জোটে নিষ্ক্রিয় হবে তারা। তারপর যুগপৎ রাজনীতি অব্যাহত রাখবে বিএনপি-জামায়াত।
জামায়াতের দলীয় সূত্র জানায়, জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি এখন সমাজ বিনির্মাণে মনোযোগ দেবে। তারা এরই মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। আপাতত রাজনীতির মাঠে থেকে নিজেদের পুরোপুরি গুটিয়ে নেবে জামায়াত। আগামী ৩০ বছর শুধু সামাজিক কাজ ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে তৎপরতা চালাবে তারা। সূত্র মতে, জামায়াত প্রশাসন থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল সৃষ্টি করবে। তাদের তরুণ প্রজন্ম অনেক দিন ধরে দলটির স্বাভাবিক কোনো কার্যক্রমে অংশ নিতে পারছে না। এ ছাড়া জামায়াত পরিচয়ে রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়তেও প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। এ কারণে কৌশলগতভাবে তারা এখন বিভিন্ন সেক্টরে দক্ষ জনবল তৈরিতে মনোযোগী হচ্ছে। জামায়াত সমর্থক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের মতে, একাত্তরে বিতর্কিত ভূমিকা, জঙ্গিবাদ, জ্বালাও-পোড়াওয়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে অর্থ ও জনবল সংকটে পড়েছে তারা। আর এ কারণেই ভিন্ন পথে হাঁটছে জামায়াতে ইসলামী।
উল্লেখ্য, দলে সংস্কার ও মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভ‚মিকার জন্য জাতির সামনে ক্ষমা চাওয়ার দাবি ওঠার পর মতবিরোধ দেখা দিয়েছে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বে। দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের পদত্যাগ এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও সাবেক শিবির নেতা মুজিবুর রহমান মঞ্জুর বহিষ্কার আদেশের পর এই বিরোধ আরো তীব্র হয়েছে। দলের ভেতর চাপে পড়েছে সংস্কারপন্থিরা। রবিবার জামায়াতকে স্বাধীনতাবিরোধী দল উল্লেখ করে দিনাজপুরের এক নেতা মঙ্গলবার জামায়াতে ইসলামীকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী আখ্যায়িত করে গাইবান্ধা জেলায় দলটির চার নেতা পদত্যাগ করেছেন। এ অবস্থায় দলটির অভ্যন্তরে বর্তমানে অস্থির অবস্থা বিরাজ করছে।







